আতংকের চেয়ে ক্ষুধার যন্ত্রণা বেশি

1211

ছবি : খাদ্য সামগ্রী পাওয়া পর উৎফুল্ল একজন পঙ্গু মানুষ। শুক্রবার নারায়ণগঞ্জের উত্তর চানমারী থেকে তোলা।       

সোহেল আহমেদ :সংসার চালাতে রাজধানীর মতিঝিল এলাকায় খোলা আকাশের নিচে খাবার বিক্রির দোকান দিয়ে বসেন অনেকেই।  স্বল্প আয়ের দিনমজুর, রিকশা চালকরা তার কাছে কম দামে খাবার কিনে ক্ষুধা নিবারণ করেন। তারা সংসারের ঘানি টানতে করোনাভাইরাসের ভয়কে দূরে ঠেলে খাবার বিক্রি করে সংসার চালানোর চেষ্টা করছেন। এর মাধ্যমে একদিকে দিনমজুর, রিকশা চালকরা যেমন কম টাকায় পেট ভরে খেতে পারেন, অন্যদিকে সংসার চালানোর খরচ যোগাড় হয়। খাবার বিক্রেতাদের অভিযোগ, সরকার খাবার বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা না দিলেও পুলিশ বাধা দিচ্ছে। এমনকি উঠিয়ে দিচ্ছে; কখনো কখনো পিটুনিও দিচ্ছে। রান্না করে রাস্তায় বসে বিক্রি করা লালনা বলেন, এখানে রিকশা চালকদের মতো গরিব মানুষরা খেতে আসে। ডিম দিয়ে আমরা ভাত বিক্রি করি ৪০ টাকা। তিনি বলেন, পুলিশ গাড়ি নিয়ে এসে দাবা দিলেও সেনাবাহিনীর সদস্যরা কিছু বলে না। সেনাবাহিনীর সদস্যরা এসে বলে আপনারা খাবার বিক্রি করেন। কোনো সমস্যা নেই। পলিথিনে ভাত বিক্রি করবেন।
মতিঝিলে খোলা আকাশের নিচে খাবার বিক্রি করা আরেকজন বলেন, আমাদের কাছে খেতে আসাদের বেশিরভাগ রিকশা চালক। পুলিশ আমাদের খুব সমস্যা করে। তিনি বলেন, আমার এক ছেলে প্রাইভেটকার চালায়। মাসে ১৫ হাজার টাকা পায়। কিন্তু এখন তার প্রাইভেটকার চালানো বন্ধ। মাসে ঘর ভাড়া দেয়া লাগে ৯ হাজার টাকা। আর এক ছেলে স্কুলে পড়ে। তার কোচিংয়ে মাসে দেয়া লাগে এক হাজার টাকা। তিনি বলেন, আমার স্বামী নেই। ছেলে যে টাকা পায় তা থেকে ঘর ভাড়া দেয়ার পর পাঁচ হাজার টাকা থাকে। এ টাকা দিয়ে তো সংসার চলে না। তাই বাধ্য হয়ে খাবার বিক্রি করি।
মতিঝিলের খোলা আকারের নিচে রাস্তার দোকান থেকে খাবার কিনে খাওয়া এক রিকশা চালক বলেন, ঢাকায় আসার পর সব কিছু বন্ধ হয়ে গেছে। তাই বাড়ি ফিরতে না পেরে ঢাকায় থেকে গেছি। বেকায়দায় পড়ে গেছি। গাড়ি চলাচল শুরু হলে গ্রামে ফিরে যাবো। এই খালারা আছে বলে আমরা এখন দু’মুঠো খেতে পারছি।
করোনাভাইরাসের কারণে সারাদেশ এখন লকডাউন অবস্থা। জরুরী কারণ ছাড়া ঘর থেকে বের হতে মানা। এমতাবস্থায় বড়ই বিপাকে পড়েছেন খেটে খাওয়া নিন্ম আয়ের মানুষ। তাদের ঝুঁকিটা শুধু স্বাস্থ্যগত নয়, বরং তার চেয়ে অনেক বেশি জীবন ধারণের। তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকিটাও অন্যদের থেকে বেশি। তারা থাকেন অস্বাস্থ্যকর, ঘিঞ্জি ও নোংরা পরিবেশে। সেখানে পর্যাপ্ত ভেন্টিলেশন ও পয়ঃনিষ্কাশনের ব্যবস্থা থাকে না। ছোট্ট একটি কামরায় অনেক মানুষ গাদাগাদি করে থাকেন। ফলে স্বাভাবিকভাবেই সেখানে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি অনেক বেশি। তবে করোনা মহামারীর কারণে নিম্ন আয়ের এ সুবিধাবঞ্চিত মানুষগুলো স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি নিয়ে যতটা উদ্বিগ্ন, তার থেকে বেশি উৎকণ্ঠিত ক্ষুধা নিবারণের জন্য। তাদের একটাই কথা- কাম না করলে খামু কেমনে? বউ-বাচ্চাকে কী খাওয়ামু?
বুুুড়িগঙ্গা নদীতে খেয়া পারাপারকারী রাজ্জাক মাঝি বলেন, হামাগ পেটতো চালাইতে হইবো। রোজ কাম করি। রোজ কামাই অয়। ওই টাকা দিয়ে সংসার চালাই, পোলাপানরে পড়াই। কাম না করলে টাকা পামু কই। আমাগো খাওয়াইবো ক্যাডা। ক্ষুধার জ্বালা বড় জ্বালা। করোনার চেয়ে ভয়ঙ্কর পেটের ক্ষুধা। বৃদ্ধ কাঞ্চন মিয়া বলেন, ভাড়া নৌকায় নদীতে খেয়া পারাপার করি।  প্রতিদিন ৪০০-৫০০ টাকা আয় করতাম। সেখান থেকে ঘাট মালিককে ও নৌকার মালিককে দেয়ার পরে ৩০০ টাকা থাকতো। গত বিশ বছর ধরে আগানগর ঘাট থেকে মিটফোর্ড ঘাটে যাত্রী পারাপার করেছেন তিনি। এর আগে এমন পরিস্থিতি কখনো দেখননি বলে জানান কাঞ্চন মিয়া।
কেরানীগঞ্জের আজীজ মিয়া ছয় ছেলে মেয়ে জামাই মিলে ১০ জনের সংসার চালাতেন চায়ের দোকান দিয়ে।  এতদিন মোটামুটি তাদের ভালোই চলছিল। কিন্তু কয়েকদিন ধরে লকডাউন অবস্থা থাকায় বিপাকে পড়েছেন তারা।  আজীজ মিয়া জানালেন, এভাবে চলতে থাকলে তাদেরকে না খেয়ে মরতে হবে। চুনকুটিয়া পূর্ব আমিন পাড়ার তাসলিমা ও আন্না দুই বোন। দুজনেই কেরানীগঞ্জের একটি গার্মেন্টসে চাকরি করতেন। বৃদ্ধ মায়ের কাছে সন্তান রেখে যেতেন তারা। নাতিদের দেখাশোনা করতেন মা। যে আয় রোজগার হতো তা দিয়ে চলতো তাদের সংসার। কিন্তু গার্মেন্টস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অর্ধেক টাকা পেয়েছেন তারা। তাসলিমা বলেন, এমন একটা অবস্থা আমাদের। সরকারের পক্ষ থেকে সাহায্য আসলেও, তা আমাদের ভাগ্যে জুটবে না। কারণ অনেকেই মনে করেন, যারা গার্মেন্টসে চাকরি করেন,  তারা তো ভালো আয় করেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে কেরানীগঞ্জের গার্মেন্টসে যারা চাকরি করেন, তারা যা পায় তা দিয়ে কোনমতে সংসার চলে। সরকার যদি আমাদের দিকে এখন না তাকায়, তাহলে আমাদেরকে অর্ধাহারে থাকতে হবে।
পেটের ক্ষুধার জ্বালায় ঢাকার বাইরে দেশের প্রত্যন্ত চরাঞ্চলের শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে নেই করোনা আতঙ্ক। তাদের চোখে মুখে ফসল বাঁচানোর চিন্তা। এদের কেউ কেউ কৃষি শ্রমিক। অন্যের জমিতে কাজ করলেই চুলোয় ওঠে ভাতের হাঁড়ি। তাই করোনা সংক্রমণ নিয়ে এরা চিন্তিত নয়। এদের কপালে চিন্তার ভাজ দু’মুঠো ভাতের যোগান নিয়ে।
রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার নোহালী ইউনিয়নের চরাঞ্চলে সামাজিক দূরত্ব কিংবা সঙ্গরোধের বালাই নেই সেখানকার মানুষের মধ্যে। বাড়ির বাইরে মাঠে মাঠে চলছে আলু উত্তোলন। কেউবা ব্যস্ত আউশের চারা রোপণে। চরের উত্তপ্ত বালুর বুকে কেউ কেউ তুলছে বিষবৃক্ষ তামাকপাতা। সচেতনতার অভাবের চেয়ে এখানকার অসহায়, দুস্থ ও শ্রমজীবী মানুষের পেটের ক্ষুধা মেটানোর অভাবটা একটু বেশি। তাই সরকারি নির্দেশনা কিংবা করোনা মোকাবিলায় সঙ্গরোধে থাকার বিষয়টি এখানে উপেক্ষিত। মর্ণেয়ার চরের কৃষি শ্রমিক খতিবার মিয়া বললেন, ‘হামার এত্তি বিদেশি অসুক (রোগ/ভাইরাস) আইসপার নয়। হামরা কামলা দিয়া খাই। ঘরোত থাকলে পেট চলবে কেমন করি। কায়ো তো খাবার ব্যবস্থা করি দিলে না। ওই করোনা ওগের (রোগের) চ্যায়া প্যাটের ভোক (ক্ষুধা) বেশি ভয়ংকর। রংপুরের গঙ্গাচড়ার ছোট-বড় ২৭টি চরে প্রায় ১৩ হাজার পরিবারের বাস। আর নোহালী থেকে মর্ণেয়া ইউনিয়ন পর্যন্ত ১৯ কিলোমিটার তিস্তা প্রতিরক্ষা বাঁধে আশ্রিত পরিবারের সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার। শ্রম বিক্রিই নদীভাঙনে নিঃস্ব এসব পরিবারের একমাত্র বেঁচে থাকার পথ। তাই নিজেদের জীবিকার তাগিদে তাদের প্রতিদিনের সকালটা শুরু হয় কাজের সন্ধানে।
এলাকার মানুষ বলছেন. খেটে খাওয়া মানুষজন জীবিকার তাগিদে কাজে ছুটছেন। এখানে চলাফেরাতেও নেই কোনো সীমাবদ্ধতা। এসব মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করলে করোনা সংক্রমণ রোধে সঙ্গরোধ বা সামাজিক দূরত্বও নিশ্চিত হবে। ঝুঁকিমুক্ত থাকবে গ্রামের মানুষও।