কথায় কথায় সাংবাদিকদের চাকুরিচ্যুতি মানি না, মানবো না

847

।। সাখাওয়াত হোসেন বাদশা ।। 

শ্রমিক দিবস। শ্রমজীবী মানুষের অধিকার ও দাবি আদায়ের দিন।আর একদিন পর ৩মে বিশ্ব গণমাধ্যম দিবস। এই দু’টি দিবস বাংলাদেশের গণমাধ্যমের জন্য আশির্বাদ হয়ে দেখা দিয়েছে- এমন তথ্য আমার জানা নেই। এরকম কোন তথ্য থাকলে যারা অবিভক্ত সাংবাদিক ইউনিয়নে রাজনীতি করেছেন তারা বলতে পারবেন।

বরং আমরা যেটা দেখছি- এসব দিবসকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে গণমাধ্যমের কর্মীরা আরও অধিকহারে নিষ্পেশিত হয়। গত কয়েক বছর ধরে আমরা এমনটিই দেখে আসছি। এ নিয়ে সাংবাদিকদের মধ্যে এক ধরণের ক্ষোভ বিরাজ করলেও বিভক্ত ইউনিয়নের দলীয় রাজনীতির করাল থাবায় সাধারণ সাংবাদিকদের ক্ষোভগুলো বুকের ভেতরই চাপা পড়ে থাকে।

গত এক বছরের সাংবাদিক নিপীড়নের চিত্রটাই যদি সামনে আনি তাহলে আমরা দেখতে পাবো- ইনকিলাব, চ্যানেল ৯, ডেইলি সান, আমাদের সময়, সমকাল, যায়যায় দিন, আলোকিত বাংলাদেশ, দৈনিক বর্তমান, মানবকন্ঠ, প্রথমআলো, সারাবাংলা, ঢাকা ট্রিবিউন, বাংলানিউজ২৪, বিডিনিউজ, এসএটিভিসহ অনেক পত্রিকা ও টিভি চ্যানেল থেকে গণমাধ্যম কর্মীদের চাকুরিচ্যুত করা হয়েছে।

আবার করোনাভাইরাসের প্রভাবে গণমাধ্যম কর্মীরা যখন কঠিন সময় পার করছে তখনও চাকুরিচ্যুতি থেমে নেই। এসএটিভি, জিটিভি, আলোকিত বাংলাদেশ সহ বেশ কয়েকটি পত্রিকা ও টিভি চ্যানেল অমানবিকভাবে গণমাধ্যম কর্মীদের চাকুরিচ্যুত করেছে। বেতনভাতা বকেয়া রেখেই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বেশ কয়েকটি পত্রিকা।

যেকোন প্রতিষ্ঠাণেরই চাকুরিচ্যুতির অধিকার যেমন রয়েছে, তেমনি কি কারণে এই চাকুরিচ্যুতি তা সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যম কর্মীর জানার অধিকারও রয়েছে। কিন্ত আমাদের এখানে তা জানানোতো দূরের কথা; উল্টো বেতন ও বকেয়াটা পর্যন্ত দেওয়া হয়না।

এই যে গণমাধ্যম কর্মীরা ঠকছে এবং শোষিত হচ্ছে- এর পেছনে বড় একটা ভূমিকা থাকে সংশ্লিষ্ট হাউজের কতিপয় সাংবাদিকের। যারা গণমাধ্যম জগতের বাইরে ক্লিন ইমেজের ব্যক্তি হিসাবেই সুপরিচিত।

খোঁজ নিলে দেখা যাবে দেশের ৯৫ ভাগ পত্রিকা, টিভি চ্যানেল ও অনলাইনে অদ্যাবধি পর্যন্ত মার্চ মাসের বেতন হয়নি। আবার এসব গণমাধ্যমে ৩ মাস, ৬ মাস থেকে শুরু করে ২০ মাসের পর্যন্ত বেতন বকেয়া রয়েছে। এই হচ্ছে বাংলাদেশের গণমাধ্যমের সার্বিক চিত্র।

এই দূরাবস্থার মধ্যে সাংবাদিকদের সংসার চলে নিদারুণ কষ্টে। এই কষ্টটা আমরা দেখেছি বন্ধু দিনেশ দাস যখন সড়ক দূর্ঘটনায় মারা যায় তখন তার মরদেহ সৎকারের জন্য কোন অর্থ ছিল না বৌদির কাছে। আবার ভূমি ব্যবসায়ী আমিন মোহাম্মদ গ্রুপের পত্রিকায় কর্মরত করোনাকালের সম্মুখ সারির কলম সৈনিক স্নেহের ছোট ভাই হূমাযুন কবির খোকনের করূণ মৃত্যুতেও আমরা দেখলাম।

করোনায় আক্রান্ত খোকনের চিকিৎসার জন্য তার সংসারে কোন টাকা ছিল না।সন্তান চিকিৎসার কথা বললে, বুকের ভেতর কষ্ট চেপে হাসি মুখে পিতার উত্তর ছিলো- ও কিছু নারে ব্যাটা। টনসিলের কারণে কাশিটা একটু বেড়েছে।অগত্যা সন্তানের জমানো সাড়ে ৩ হাজার টাকা নিয়েই খোকনকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে যেতে হয় এবং স্নেহের ছোট ভাই আমার পৃথিবী থেকে শেষ বিদায় নেয়।

আজ শ্রমিক দিবস এবং একদিন পরই বিশ্ব গণমাধ্যম দিবস।এবারের এই দু’টি দিবসে অন্তত কমন কিছু বিষয় নিয়ে গোটা সাংবাদিক সমাজকে ঐক্যেরে পতাকাতলে আসতে হবে। সাংবাদিক সংগঠনগুলোকে খুব জোরালোভাবেই আওয়াজ তুলতে হবে- গণমাধ্যম কর্মীদের ন্যায়সঙ্গত পাওনা দিতে হবে; বেতন নিয়মিত করতে হবে; বকেয়া বেতন পরিশোধ অত্যাবশ্যক।কথায় কথায় চাকুরিচ্যুতি মানি না, মানবো না।

কঠিন এই দু:সময়ে এই আওয়াজ উঠতে হবে- বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে) ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে) এর উভয় অংশ থেকেই।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক।   
সাবেক সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক
ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ)।