করোনাভাইরাস, পিপিই ও বিপন্ন মানবতা

822

সাখাওয়াত হোসেন বাদশা *

দেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগির সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে।অনেকের মতে, বাংলাদেশে করেনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগির সংখ্যা চূড়ান্ত রূপ নিবে মে/জুন মাসে। এ পর্যন্ত আমাদের ধৈয্যের সাথেই সব পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হবে। সরকারের তরফ থেকে বিশেষ করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্তরিকতার সাথেই সব কিছু দেখভাল করছেন। কিন্ত আমলা থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, স্বান্থ্যমন্ত্রী সবাই প্রধানমন্ত্রীকে ধোঁয়াসার মধ্যে রেখেছেন। তাকে যে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে- এটা তিনি নিজেও বুঝতে পারছেন। একেই বলে আমলাতানিত্রক চাটুকারিতা।

একটি দেশে রাজনীতিবিদদের পাশ কাটিয়ে ব্যবসায়ী ও সাবেক আমলারা যখন রাজনীতির নিয়ামক হয়ে উঠেন, সংসদের আইন প্রণেতা হয়ে যান এবং ৩০০ আসনের ২৫০ আসই যখন তাদের দখলে চলে যায়; তখন জনগণের সুখ-দু:খটাও মাপা হয় ব্যবসায়ীক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। বাংলাদেশে আজ যে করোনা দূরাবস্থা চলেছে, এটির জন্য সরকার দায়ী নয়। সারা বিশ্বই আজ এই ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকবেলা করছে। বাংলাদেশের জন্য এই পরিস্থিতি মোকাবেলাটা আরও সহজ হতো, যদি প্রকৃত রাজনীতিবিদরা আজ জনপ্রতিনিধি থাকতেন। এই দু:সময়ে জনগণের কিসে ভাল, রাজনীতিবিদরা অন্তত সেটি অনুধাবণ করতে পারতেন অনেক সহজেই- এটি আমার বিশ্বাস। অথচ আজ তারা জাতীয় সংসদে নেই।

দেশে এই ভাইরাসটি প্রথম দেখা দেয় গত ৮ মার্চ।ভাইরাসটি দেখা দেওয়ার পর থেকেই সরকার তার সচেতনতামূলক নানামুখি পদক্ষেপ নিয়েছে। কিন্ত সরকারের করনীয় নির্দেশনার সাথে বাস্তবতার যে কত অমিল, এটা এখন খোদ প্রধানমন্ত্রী অনুধাবন করছেন। দেশের স্বাস্থ্যখাতের সাথে জড়িতরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকেও ভুল বুঝানোর চেষ্টা করেছেন- ছেলে ভোলানো কথা বলে। গণমাধ্যমে এ নিয়ে কোন সংবাদ প্রকাশ হলেও ওইসব আমলারা নাখোশ হন। নানা ধরণের বিধিনিষেধ আরোপের চেষ্টাও হয়েছে।সকালে সার্কুলার জারি করে তা আবার বিকেলেই প্রত্যাহার করা হয়েছে। এসবই করা হয়েছে- নিজেদের গদি ঠিক রাখতে। কিন্ত বাস্তবতা হচ্ছে- এর মধ্যে দিয়ে দেশের মানুষকে, সরকারকে অন্ধকারে রাখার যে প্রবনতা চালানো হয়েছে, তাতে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে বাংলাদেশ।

করোনায় আর একটি জিনিষ প্রমাণিত, এদেশের কিছু মানুষ তার মানবতাবোধকে জলাঞ্জলি দিয়েছে। করোনা আক্রান্ত সন্দেহে তারা মাকে পর্যন্ত রাস্তায় ফেলে যায়। অভুক্ত মানুষের চাল চুরি করে। খাটের নিচে টিসিবি’র ভোজ্য তেল লুকিয়ে রাখে। মানুষে হাহাকার দেখেও এদের হৃদয় গলে না। এরা পাষন্ড। এরা কোন দলের কর্মী হতে পারে।যেমনিভাবে এদের বিচার হওয়া উচিত, ঠিক একইভাবে যারা হাসপাতালের প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি, পিপিই ও মাস্ক ক্রয়ের টাকা লুটপাট করছে এবং নকল জিনিষ সরবরাহ করছে তাদেরও বিচার হওয়াটা এখন অপরিহার্য। সময় এসেছে খতিয়ে দেখার- স্বাস্থ্যখাতের হাজার হাজার কোটি টাকা কোথায় ও কিভাবে বিনিয়োগ হয়েছে?

পরিস্থিতি এমন যে আজ মাঠ পর্যায়ের চিকিৎসক ও স্বাস্থকর্মীরাই বলছেন, তাদের অনেকেই এখনও পিপিই পায়নি, আবার যারা পেয়েছেন তাদের অনেকেরটাই মানসম্মত নয়। আর মাস্ক ব্যবহারের জন্য যা দেওয়া হয়েছে তা অতি সাধারণ মানের। এই মাস্ক ব্যবহার করে করোনার রুগি দেখা একেবারেই ঝুঁকিপূর্ন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কোনো এন৯৫ মাস্ক দেয়া হয়নি। সার্জিক্যাল মাস্ক যা দেয়া হয়েছে, সেগুলোর সংখ্যাও অপ্রতুল। আবার ডিসপোজেবল পিপিই সরবরাহ করে সেগুলো আবার ধুয়ে ব্যবহার করার জন্য বলা হয়েছে। সেগুলোর সংখ্যাও খুব কম।

চিকিৎসকদের করুণ আর্তি ফুটে উঠেছে নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালের অ্যানেস্থেশিয়া বিভাগে কর্মরত মেডিকেল অফিসার আবু তাহেরের স্ট্যাটাসে। ১৬ই এপ্রিল তার ফেসবুক পাতায় তিনি লেখেন: ‘এখন পর্যন্ত আমি সহ আমার ডিপার্টমেন্ট এর কেউ ১টিও n95/kn95/ffp2 মাস্ক পাইনি। তাহলে স্বাস্থ্য সচিব মিথ্যাচার কেন করলেন উনি n95 ইকোয়িভেলেন্ট মাস্ক দিচ্ছেন? এই মিথ্যাচার এর শাস্তি কি হবে?’ এই হচ্ছে স্বাস্থ্যখাতের প্রকৃত চিত্র।যারা সব ঠিক আছে বলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে মিথ্যাচার করেছেন, তাদের মুখোশটা এখন জনগণের কাছে উন্মোচন হয়ে গেছে।

করোনার কারণে দেশের মানুষ আজ দেখতে পারছে রাজনীতিতে অন্ধ হয়ে যাওয়া বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতটি বাস্তবে কতটা ভঙ্গুর।হাসপাতাল আছে। আইসিইউ নেই। আবার আইসিইউ থাকলেও তা সচল নেই। কোভিড-১৯ বা নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত রোগীকে শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক রাখতে দেশের হাসপাতালগুলোতে ভেন্টিলেটরের পরিমান খুবই কম। অনেক হাসপাতালে ভেন্টিলেটর থাকলেও তা অকেজো। আবার এটি চালানোর লোক নেই।সেন্ট্রাল অক্সিজেন সিস্টেম নেই।কোন কোন হাসপাতালে থাকলেও তা সচল নেই।

চিকিৎসকরা আছেন শুধুই রাজনীতি নিয়ে। পেশাগত দায়িত্বও অনেক চিকিৎসক ঠিকভাবে পালন করেন না।একসময় ভালমানের চিকিৎসকরা হয়রানির শিকার হতেন ড্যাবের কারণে। আর এখন দাবড়ে বেড়াচ্ছে স্বাচিপ। এই অন্ধ মানসিকতার বলি হতে হয়েছে তাদেরই এক সহকর্মীকে। করোনায় আক্রান্ত হয়ে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. মঈন উদ্দিনকে তার হাসপাতালেই ভেন্টিলেটর সাপোর্ট দেওয়া যায়নি।এমনকি সহকর্মীদের অতিমাত্রার দলবাজির কারণে ঢাকার কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে তাকে আসতে হয়েছে নিজ উদ্যোগে একটি সাধারণ এ্যাম্বুলেন্স জোগাড় করে। তারপরের কাহিনী অতি করুণ ও হৃদয় বিদারক। চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ১৫ এপ্রিল তিনি মৃত্যুবরণ করেন। আর তিনিই হচ্ছেন বংলাদেশে করোনা যুদ্ধে মৃত্যুবরণকারী প্রথম চিকিৎসক।

দেশের স্বাস্থ্যখাতের এই দূরাবস্থার মধ্যেই করোনা আক্রান্ত রোগির সংখ্যা বাড়ছে জ্যামিতিক হারে।গত ৮ মার্চ থেকে গতকাল রোববার (১৯ এপ্রিল) পর্যন্ত করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন ২৪৫৬ জন। আর ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন মোট ৯১ জন। করোনায় আক্রান্ত ডাক্তারের সংখ্যা ১৫০ জন ছাড়িয়ে গেছে, নার্স শতাধিক, সাংবাদিক ১৭ জন। আর গত ১৫ই এপ্রিল পর্যন্ত করোনাভাইরাসে ৫৮ জন পুলিশ সদস্য আক্রান্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। আক্রান্তের তালিকায় সেনাবাহিনীর সদস্যরাও রয়েছেন। তবে আইএসপিআর এই সংখ্যা প্রকাশ করেনি।আক্রান্তের তালিকায় রয়েছেন মাঠ প্রশাসনে কর্মরত অন্যান্য বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারিরাও।

পরিস্থিতির ভয়াবহতা রোধে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সমগ্র বাংলাদেশকে ঝুঁকিপূর্ন ঘোষনা করেছে। কিন্ত কথায় আছে ‘সময়ের এক ফোঁড়, অসময়ের দশ ফোঁড়’। বাংলাদেশে করোনা আক্রান্তের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেওয়ার পেছনে যেসব বিষয় কাজ করেছে তার মধ্যে রয়েছে- বিজিএমইএ এর অদূরদর্শি সিদ্ধান্ত। যারা হাজার হাজার গার্মেন্টস শ্রমিককে ঢাকায় ডেকে আনে।করোনার ভয়াবহতার মাঝেও কতিপয় ধর্ম ব্যবসায়ীর ওয়াজ-মাহফিল অব্যাহত রাখা, অনিয়ন্ত্রিত হাট-বাজার এবং সর্বশেষ ব্রাক্ষণবাড়ীয়ায় ধর্ম ভিত্তিক একজন রাজনৈতিক নেতার জানাযায় লক্ষাধিক মানুষের অংশ নেওয়ার ঘটনাগুলো বাংলাদেশকে আরও ঝুঁকির মধ্যে নিয়ে গেছে।

এই ঝুঁকি সামাল দেওয়াটা সরকারের জন্য যেমন কঠিন, তেমনি এসব ঘটনা জাতির জন্যও দু:সংবাদ। আমাদের ভাবার সময় এসেছে যে, করোনাভাইরাস যেখানে বাংলাদেশে মে/জুন মাসে সর্বোচ্চ পর্যায়ে যাওয়ার কথা; সেখানে এখনই দেশের হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। আর প্রয়োজনীয় রসদের অভাবে ‘ফ্রন্ট লাইনের যোদ্ধাদের’ মধ্যে বিরাজ করছে এক ধরণের আতঙ্ক। তাদের এই আতঙ্কটা স্বাভাবিক।

একটা কথা আমরা সবাই জানি যে, সবকিছু পুলিশ দিয়ে ধরে বেঁধে হয়না। যুদ্ধের ময়দানে যদি সৈনিককে অস্ত্রের সাথে গুলি ও প্রয়োজনীয় রসদ না দিয়ে পাঠান, তাহলে যেমন আত্মঘাতি সিদ্ধান্ত হবে; তেমনি করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামা প্রথম সারির সৈনিক চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদেরকেও তাদের নিরাপত্তা সামগ্রী সরবরাহ করতে হবে। সেই সামগ্রী নিয়ে যেন কোন শুভঙ্করের ফাঁকি না থাকে। তাহলে যতটুকুনা চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর ক্ষতি হবে, তার চেয়ে অনেক অনেক বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হবে দেশ ও জাতি।

একথা ঠিক যে, ডাক্তার ও স্বাস্থকর্মীরা যেমন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগির সেবা করছেন, তেমনি সাংবাদিক, আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারি বাহিনীও করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে মাঠে রয়েছেন। এক্ষেত্রে চিকিৎসক ও স্বাস্থকর্মীদের পাশাপাশি কর্মরত প্রতিটি সংবাদকর্মীর যেমন ব্যক্তিগত সুরক্ষা পোষাকের প্রয়োজনটা অপরিহার্য, তেমনি সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, পুলিশ, র‌্যাব, আনসার থেকে শুরু করে মাঠ পর্যায়ে যেসব বিভাগের কর্মীরা দায়িত্ব পালন করছেন তাদেরকেও সুরক্ষিত পোষাক পরিয়ে কাজে নামানো উচিত।

আর এই কাজটি করতে হবে নিজের স্বার্থে, পরিবারের স্বার্থে, ডিপার্টমেন্টের স্বার্থে এবং সর্বোপরি দেশের স্বার্থে।

সবশেষে যে কথাটি বলতে চাই, করোনাভাইরাসকে কেন্দ্র করে একটা ভয়াবহ দূরাবস্থার মধ্যে আমরা পড়েছি। অর্থনৈতিক সঙ্কট, খাদ্য সঙ্কট, চাকুরি সঙ্কটসহ নানা রকমের সঙ্কট সরকারের একার পক্ষে কাটিয়ে উঠা সম্ভব নয়। কিম্বা অন্যের ঘরে আগুন লেগেছে, সেই আগুনে আলু পোড়া খাব- এই মানসিকতাও কারো পোষণ করাটা এই নিদানকালে ঠিক হবে না।

এই ঝুঁকি মোকাবেলা করতে হবে সন্মিলিতভাবেই। দেশের সকল রাজনৈতিক দলকে এগিয়ে আসতে হবে। নিরন্ন মানুষের মুখে অন্ন তুলে দিতে হবে।অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। করোনায় আক্রান্ত কোন রোগি যেন অবহেলা কিম্বা ঘৃণার পাত্রে পরিণত না হন- আমাদের সেই মানবতা জাগ্রত করতে হবে। সেই ভুপেন হাজারিকার বিখ্যাত গানের মত ‘মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য…

লেখক :সাবেক সভাপতি ও সাধারনসম্পাদক   ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ)।