গ্যাসের দাম বৃদ্ধি : দিশেহারা নারায়ণগঞ্জের শিল্প মালিকরা

24

* চাপ সহ্য করতে না পারলে অনেক ফ্যাক্টরী বন্ধের আশংকা

মুহা, ইউসুফ আল আজিজ  :
তীব্র গ্যাস সংকটে কারনে নারায়ণগঞ্জের শিল্প কলকারখানা গুলোতে এমনিতেই দীর্ঘদিন ধরে বিরাজ করছে ত্রাহি অবস্থা। তার ওপর গ্যাসের দাম বাড়ায় নতুন করে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন শিল্প গ্রাহকেরা। অনেকটা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তারা। গ্যাস সংকটের মাঝে আবারো দাম বৃদ্ধিকে মরার উপর খাঁড়ার ঘা বলছেন শিল্প মালিকরা। এ নিয়ে ক্ষুব্দ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন নারায়ণগগঞ্জ ও বন্দর পূর্বাঞ্চল শিল্প মালিক সমিতির নেতারা।
নারায়ণগঞ্জ পূর্বাঞ্চল শিল্প মালিক সমিতির সভাপতি ও জাহিন নীট ওয়্যার লিমিটেডের এমডি এম জামালউদ্দিন বলেন, শিল্পখাতে গ্যাসের দাম দ্বিগুনের চেয়েও বেশী বৃদ্ধি পেয়েছে । এ মূল্য বৃদ্ধি শিল্প খাতে অনেক সংকট সৃষ্টি করবে। সংশ্লিষ্ট সবাই চাপের মধ্যে পড়ে যাবে।
তিনি বলেন, গ্যাসের দাম বৃদ্ধির চাপ সহ্য করতে না পেরে অনেক ফ্যাক্টরী হয়তো বন্ধ হয়ে যেতে পারে। ফলে বেকারত্ব বাড়বে। আন্তর্জাতিক বাজার হারাবো আমরা। শিল্পের সক্ষমতা হারাবো। আমরা যদি কমপেটিভ( প্রতিযোগিতা) হতে না পারি তাহলে অর্ডার অন্য দেশে চলে যাবে। সামনে আমাদের জন্য কঠোর সংকট অপেক্ষা করছে।
নারায়ণগঞ্জ পূর্বাঞ্চল শিল্প মালিক সমিতির সহসভাপতি ও টোটাল ফ্যাশন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোঃ হাসিবউদ্দিন মিয়া বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের উত্তর পাশে বন্দরের মদনপুর থেকে লাঙ্গলবন্দ পর্যন্ত ১১টি ফ্যাক্টরী রয়েছে। ফ্যাক্টরীগুলোতে তিতাসের এক টাকাও বকেয়া নাই। গত ৮ মাস ধরে এ ফ্যাক্টরীগুলোতে তীব্র গ্যাস সংকট চলছে। অথচ মহাসড়কের দক্ষিু পাশের ফ্যাক্টরীগুলোতে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে।
তিনি বলেন, গ্যাসের অভাবে ফ্যাক্টরী গুলো বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। আগে তার ফ্যাক্টরীতে দৈনিক ২০ টন মাল ডায়িং হতো। ৮ মাস ধরে পুরোপুরি বন্ধ। এতে লোকসান গুনতে হচ্ছে শত শত কোটি টাকা। বর্তমানে আড়াইহাজার শ্রমিক তার ফ্যাক্টরী কাজ করেন। এর সঙ্গে আরও অনেক লোকের জীবন জীবীকা জড়িত। আর কয়েক মাস এভাবে চললে ফ্যাক্টরী চালানো সম্ভব হবেনা। ২৪ ঘন্টা না হোক অন্তত ১২ ঘন্টা গ্যাস সরবরাহ অব্যাহত রাখলে উৎপাদনে টিকে থাকা সম্ভব।
উল্লেখ্য, গত বুধবার শিল্পখাতে আরেক দফা গ্যাসের দাম বাড়িয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে বিদ্যুৎ জ্বালানী ও খনিজ সম্পদ বিভাগ।
সূত্র জানায়, ইতিমধ্যেই ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ ও শিল্পে ব্যবহৃত গ্যাসের মূল্য ৩০ টাকা/ঘনমিটার এবং বাণিজ্যিক (হোটেল, রেস্টুরেন্ট ও অন্যান্য) ক্ষেত্রে ব্যবহৃত গ্যাসের মূল্য ৩০.৫০ টাকা/ঘনমিটার মূল্য নির্ধারণ সরকার। বুধবার সকালে এক নির্বাহী আদেশে গ্যাসের দাম বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত জানায় সরকার।
এমন অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধিতে বিপাকে পরেছে শিল্প উদ্যোক্তারা। তাদের মতে, গ্যাসের এমন দাম বৃদ্ধি শিল্প মালিকদের জন্য ক্ষতিকর। পামাপাশি অন্য যেসব সুযোগ-সুবিধা আছে সেগুলো না বাড়ালে শিল্প প্রতিষ্ঠানের টিকে থাকা মুশিকিল হবে।
‘গ্যাসের এমন মুল্য বৃদ্ধি শিল্প খাতে কি রকম প্রভাব ফেলবে’ এমন প্রশ্নের উত্তরে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের অন্যতম সংগঠন বিকেএমইএ‘র নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির ফলে নিটের প্রসেসিং ব্যয় বাড়বে ১৫ শতাংশ। এর প্রভাব পড়বে উৎপাদনের ওপর। এ খরচ বৃদ্ধির ফলে আমাদের সক্ষমতা হারাবো। আমরা যদি বায়ারকে বলি গ্যাসের দাম বেড়েছে তাই উৎপাদন খরচ বেড়েছে, প্রতি ডজনে ৫০ সেন্ট বাড়িয়ে দাও; তারা দেবে না। এর পর যদি আমরা কম দামে অর্ডার না নিই তাহলে তারা বিকল্প সোর্সিংয়ে চলে যাবে। এতে আমরা কার্যাদেশ হারাবো।
মোহাম্মদ হাতেম বলেন, প্রতি ইউনিট ২৫ টাকা করতে। যদিও এর থেকে উদ্ভূত মূল্য পরিস্থিতি আমাদের নিয়ন্ত্রণের চলে যেতো; তারপরেও আমরা বলেছিলাম গ্যাস নিরবচ্ছিন্নভাবে সরবরাহ দিতে হবে। কিন্তু আমরা দেখছি ৩০ টাকা করেছে। এটা আমাদের জন্য খুব কঠিন হবে। আমরা সরকারের কাছে অনুরোধ জানাবো, গ্যাসের দাম কমিয়ে ২৫ টাকা করা হোক। পাশাপাশি আমাদের অন্য যেসব সুযোগ-সুবিধা আছে সেগুলো বাড়াতে হবে। যাতে আমরা টিকে থাকতে পারি।
তিনি আরও বলেন, গ্যাসের দাম বাড়বে এ বিষয়ে সরকারের সঙ্গে আমাদের আলোচনা হয়েছে। কিন্তু এত অস্বাভাবিক প্রত্যাশা করিনি। যে দাম বেড়েছে তা স্বাভাবিক ও সহনীয় পর্যায় নেই।
নানা সমস্যার বিষয় তুলে ধরে মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে এমনিতেই উৎপাদন খরচ বেড়েছে। সেটা এয়ারফ্রেইট হোক আর শিপপ্রেইট হোক-উভয় খরচ বেড়েছে। বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধিতে সমস্যা প্রকট করে তুলেছে। গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির ফলে সমস্যা আরও প্রকট হবে। ডাইস কেমিকেল থেকে শুরু করে সব ধরণের মেটা রিয়ালের দাম বেড়েছে। তারপর যদি গ্যাসের বিল বাড়ে তাহলে কস্ট অব ডুইং বেড়ে যাবে। যদিও এ সমস্যা বিশ্বজুড়ে। এর প্রভাব পড়েছে মূল্যস্ফীতিতে।