গ্যাস ও বিদ্যুতের লাইন যেন মৃত্যুফাঁদ!

232

মিরর বাংলাদেশ :

গ্যাস ও বিদ্যুতের লাইন যেন মৃত্যুফাঁদ। োপ্রতিনিয়ত মৃত্যুর মিছিল লম্বা হচ্ছে। দুয়ারে  এসে কড়া নাড়ছে মৃত্যু। কিন্তু আমরা সেই একই তিমিরে থেকে যাচ্ছি। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের ঝুঁকিপূর্ণ লাইন মেরামত হচ্ছে না। দীর্ঘ দিনের পুরানো, জরাজীর্ণ। অপরিকল্পিত। অবৈধ। অনিরাপদ পাইপ বা তারে ভরা। প্রতিনিয়ত এসব থেকে দুর্ঘটনা ঘটছে। কিন্তু প্রতিকার নেই। জবাবদিহিতার অভাবেই অগ্নিকা- ও প্রাণঘাতী ঘটনা বন্ধ হচ্ছে নাÑ মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট এর তথ্য অনুযায়ী, আগুনে পোড়া রোগীর ৪০ শতাংশই গ্যাস বা বিদ্যুতে পোড়া। দেশে প্রতিবছর ৭ লাখেরও বেশি মানুষ আগুনে পুড়ে হতাহত হন। যাদের বেশিরভাগই রান্নার গ্যাসের আগুনে। তারমধ্যে বড় অংশ সিলিন্ডার গ্যাস। রান্নার গ্যাসে অগ্নিদগ্ধদের মধ্যে বছরে কমপক্ষে ৩ হাজার জনের মৃত্যু হয়। আর প্রাণে বেঁচে যাওয়াদের অধিকাংশই কর্মক্ষমতা হারান। ইনস্টিটিউট এর তথ্য অনুযায়ী, বছরে প্রায় ৭০ হাজার জন চিকিৎসা নেন দগ্ধ হয়ে। এরমধ্যে প্রায় ২০ হাজার জন বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনার শিকার। ২০১৭ সালে বিদ্যুতে দগ্ধ হয়ে ১৭ হাজারের বেশি মানুষ চিকিৎসা নিয়েছেন। আর ২০১৬ সালে ১৫ হাজারের বেশি।

ফায়ার সার্ভিসের পরিসংখ্যানে বলা হচ্ছে, রাজধানীতে অগ্নিদুর্ঘটনার প্রায় ৩০ ভাগই গ্যাসের পাইপলাইনের ছিদ্র থেকে। গত এক বছরে ছোট-বড় প্রায় এক হাজার অগ্নিকা-ের জন্য দায়ী গ্যাস।

কোন দুর্ঘটনা ঘটলে নানা প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রতিকার হয় না। পুরানো লাইন মেরামত করা হয় না। দীর্ঘদিন মাটির নিচে থাকা গ্যাস পাইপ স্থানে স্থানে ছিদ্র হয়ে আছে। রাজধানীর বহু এলাকায় রাস্তা দিয়ে হাঁটলেই এমন গ্যাস বের হওয়ার ঘটনা দেখা যাবে। টের পাওয়া যাবে রাস্তায় যত্রতত্র গ্যাস উবে যাওয়ার। ঢাকা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, সিলেট, টঙ্গীসহ বিভিন্ন স্থানে রাস্তায় ইচ্ছেমত গ্যাস উবে যাওয়ার ঘটনা বেশি। গ্যাস বিতরণ কোম্পানিরই স্থাপন করা পাইপ দিয়ে এসব গ্যাস বের হচ্ছে। অনেক স্থানে রাস্তার মাঝ বরাবরই গ্যাসের লাইন আছে। এসব গ্যাস পাইপের উপর কয়েকস্তরে পিচ পড়ে আছে। জালের মত ছেয়ে আছে পাইপ। যার অনেকটাই অপরিকল্পিত।

আবার অবৈধ পাইপও ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলেছে। সাধারণ পানির পাইপে করে অনেক স্থানে অবৈধ গ্যাস নেয়া হচ্ছে। সেখানেও ছিদ্র হচ্ছে অহরহ। এসব নি¤œমানের পাইপ দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, টাঙ্গাইল ও নরসিংদীতে অবৈধ গ্যাস সংযোগের পরিমাণ বেশি। মূল লাইন থেকে ঝুঁকিপূর্ণভাবে সাধারণ পাইপে বাসাবাড়ি ও কারখানায় গ্যাস নেয়া হয়। এসব অনিরাপদ সংযোগ থেকে প্রায়শই দুর্ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া বিভিন্ন সময় রাস্তা সংস্কারের কারণেও পাইপ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে দুর্ঘটনা ঘটে। ২০১০ সাল থেকে গ্যাস সংযোগ বন্ধ। এই সময়ে অবৈধ সংযোগের পরিমাণ বেড়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাইপ থেকে গ্যাস বেরিয়ে যদি বদ্ধ জায়গায় জমা হতে থাকে আর তার পরিমাণ বাতাসে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ হয়, তাহলে আগুন ধরার পরিবর্তে বিকট শব্দে বিম্ফোরণ ঘটে। এর পরিমাণ ২০ শতাংশ পেরোলে অগ্নিকা-ের ঘটনা ঘটে।

পাইপের গ্যাসে এক ধরনের গন্ধযুক্ত রাসায়নিক মেশানো হত। যাতে কোথাও লিকেজ হলে গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। সহজে বোঝা যায় গ্যাস বের হচ্ছে। কিন্তু এখন এই কার্যক্রম বন্ধ। ফলে সহজে বোঝা যায় না গ্যাসের উপস্থিতি।

১৯৬০ সালে বাংলাদেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের উৎপাদন ও বাজারজাত শুরু হয়। ঢাকায় বাসাবাড়িতে গ্যাস সরবরাহ শুরু ১৯৬৭ সালের দিকে। এরপর বিতরণ লাইন বাড়তে থাকে। প্রায় ২৫ হাজার কিলোমিটার গ্যাস পাইপ লাইন আছে এখন। এর মধ্যে বিতরণ ও সার্ভিস লাইন প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার।

তিতাস গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন এন্ড ট্রান্সমিশন কোম্পানির পাইপলাইন আছে প্রায় সাড়ে ১২ হাজার কিলোমিটার। এর মধ্যে ঢাকায় সাত হাজার কিলোমিটার। যার ৭০ শতাংশ অতিঝুঁকিপূর্ণ। এখানে ৫০ বছরেরও পুরোনো বিতরণ লাইন আছে। রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে দুর্ঘটনার ফিরিস্তি অনেক।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, ঢাকা শহর গ্যাস চেম্বারে পরিণত হয়েছে। যদি বড় ধরনের ভূমিকম্প হয়, তবে গ্যাস চেম্বার হয়ে থাকা এই রাজধানীর কি হবে তা কেউই জানে না।

গ্যাসের মত বিদ্যুতেরও একই অবস্থা। রাস্তায় হাঁটতে গিয়ে তার ছিঁড়ে মৃত্যু। বৈদ্যুতিক খুঁটি থেকে তার ছিঁড়ে মৃত্যু। বাড়ির ছাদে কাপড় শুকাতে গিয়ে মৃত্যু। ছাদে ঘুড়ি নামাতে গিয়ে শিশুর মৃত্যু। ঘরে পানি উঠেছে তাতে তার ছিঁড়ে মৃত্যু। বিদ্যুতের তারে এমন মৃত্যু অহরহ ঘটছে। কিন্তু কোন জবাবদীহীতা নেই। গ্রাম শহর কোথাও এই মৃত্যু থেমে নেই।

২০১৭ সালের পোড়া রোগীর ২৮ শতাংশই বাড়ির আশেপাশে টানানো তারে স্পৃষ্ট হয়ে দগ্ধ ও আহত এবং ১৯ শতাংশই বৈদ্যুতিক খুঁটির তার ছিঁড়ে দুর্ঘটনায় পড়েন। ২০১৬ সালে দগ্ধ রোগীদের মধ্যে যারা মারা গেছেন তাদের মধ্যে ৪২ শতাংশ বিদ্যুৎস্পৃষ্ট।

বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, ঢাকায় ৩৫/৪০ বছরের গ্যাস পাইপলাইন আছে। এসবের প্রায় জরাজীর্ণ। এগুলো পরিবর্তনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। রাজধানীতে দুই হাজার কিলোমিটার বিতরণ লাইন প্রতিস্থাপন করা হবে। এ ছাড়া অবৈধ সংযোগের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করা হয়েছে। গ্যাস বিতরণ ব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে পুরোনো পাইপ সরিয়ে নতুন করে স্থাপনে বড় প্রকল্প নিয়ে কাজ করা হচ্ছে।

কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ’র (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম বলেন, নিরাপত্তা মানদ- না মেনে বিদ্যুৎ বা গ্যাস লাইন সম্প্রসারণ ও সংযোগ দেয়ার কারণে দুর্ঘটনা ঘটছে। এগুলো নিছক দুর্ঘটনা নয়। বিদ্যুৎ লাইনের সম্প্রসারণ ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজে বিতরণকারী সংস্থাগুলোর ভুল এবং অবহেলার কারণে দুর্ভাগ্যজনক পরিণতির শিকার হচ্ছে জনগণ। এগুলো দুর্ঘটনা নয়, আমি বলব হত্যা।

ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (ডিপিডিসি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী বিকাশ দেওয়ান বলেন, কিছু এলাকায় আছে খোলা তার। এগুলো পরিবর্তনের উদ্যোগ চলমান আছে। ঢাকায় পর্যায়ক্রমে সব তার মাটির নিচে নেয়া হবে। তখন আর এই সমস্যা হবে না।

বিদ্যুৎ গ্যাসের পরিধি বাড়ছে। আর সাথে বাড়ছে অনিরাপদ এক বিতরণ ব্যবস্থা। অনিরাপদ জনপদেই যেন হেঁটে চলেছি আমরা। এ থেকে দ্রুত পরিত্রাণ চান সকলে।

বিদ্যুৎ কিংবা গ্যাস বিতরণে যত অনিয়ম আর দুর্নীতি এর দায় পুরোটাই বহন করতে হয় গ্রাহকদের। ঘটনা ঘটার পর আলোচনা-সমালোচনা শুরু হলে কর্তৃপক্ষ সবকিছু ধামাচাপা দেওয়ার উদ্যোগ নিলেও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় জবাবদিহিতার জায়গা তৈরি হচ্ছে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। রাষ্ট্রীয় এসব কোম্পানির নির্বাহীরা থেকে যাচ্ছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। নি¤œপদস্থ কিছু কর্মকর্তা কর্মচারীকে শাস্তি দিয়েই পার পাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ শামসুল আলম বলেন, ‘একের পর এক ঘটনা ঘটছে। আর তারা তদন্ত কমিটি আর সাময়িক বরখাস্ত করেই শেষ।  কিন্তু সাধারণ মানুষের ভোগান্তি ও হয়রানি থেকেই যাচ্ছে। বিদ্যুৎ বিলের সময় যেমন একের পর এক তদন্ত কমিটি করেছে তেমনি নিচের কিছু কর্মকর্তা সাসপেন্ড করেই শেষ। এদিকে বাড়তি বিল কিন্তু কমেনি। এখনও অভিযোগ আসছে বাড়তি বিলের এবং সাধারণ মানুষ বিচার না পেয়ে বাধ্য হয়ে সেই বাড়তি বিল দিচ্ছে। একইভাবে তিতাসের ঘটনাও একই নাটক। কয়েকজন সাসপেন্ড আর সেই তদন্ত কমিটি।

অতি সম্প্রতি বিদ্যুৎ বিলে অনিয়ম নিয়ে সারাদেশে তোলপাড় হয়েছে। প্রায় এক লাখ গ্রাহক এই বাড়তি বিলের ভোগান্তিতে পড়েন। কোম্পানিগুলো বিল ঠিক করে দেওয়ার কথা বললেও বাস্তবে অনেক গ্রাহক বাড়তি বিলই দিতে বাধ্য হন। এমনকি এখন পর্যন্ত অনেক গ্রাহক বাড়তি বিলের অভিযোগ করছেন বলে জানা যায়।

এসব ক্ষেত্রেই মিটার রিডার, বিল প্রস্তুতকারীসহ সর্বোচ্চ কোনও এলাকার নির্বাহী প্রকৌশলীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। কিন্তু পরে যখন দেখা গেছে বিতরণ কোম্পানির ঊর্ধ্বতনদের নির্দেশেই এই ভুয়া বিল করা হয়েছে তখন সমালোচনা সামলাতে নতুন তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। কিন্তু সেই কমিটির কার্যক্রম আর আলোর মুখ দেখেনি।

পাওয়ার সেলের সাবেক মহাপরিচালক বিডি রহমত উল্লাহ বলেন, ‘রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা না থাকলে তার অধীন কর্মকর্তাদেরও দায়বদ্ধতা থাকে না। তারা জানে এত বড় অপরাধের পরও তাদের কোনও শাস্তি হবে না। সাময়িক বরখাস্ত করে পরে আবার অন্য জায়গায় তার চাকরি হবে। ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত কারও দায়বদ্ধতা নেই। ফলে সেই দায় গিয়ে পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর। হয়রানি ভোগান্তি সবই তাদের। তাদের বাড়তি বিল দিতেই হবে, গ্যাসের লিকেজেও জীবন যাবে।’