ত্রানের জন্য প্রশাসনের ‘হট লাইনে’ মানুষের ফোনের পর ফোন

695
* খাদ্য সংকটে কর্মহীন মানুষের দুরবস্থা

মিরর বাংলাদেশ : প্রাণঘাতি করোনা ভাইরাসের সবশেষ মারা গেছে আরো ৫জন আক্রান্ত হয়েছে ১৮২জন। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এমন তথ্যেও পর বলার অবকাশ থাকেনা করোনা নিয়ে সামনে রয়েছে আতংকের খবর। তবে আরো আতংক আর মহাসংকটে রয়েছে কর্মহীন মানুষ। অনেকে ঘরে খাবার নেই। খাবারের সন্ধানে তারা বের হতেও পারছেন না। কারন বাসায় থাকার জন্য রয়েছে সরকারী নির্দেশনা। পাশাপাশি সন্ধার ৬টার পর বাসা থেকে বের হলে আইনানুগ ব্যবস্থা। এমতবস্থায় পরিবার পরিজন নিয়ে মহাসংকটে রয়েছে কর্মহীন মানুষ।
সূত্র জানায়, বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় যে পরিমান ত্রান দেয়া হয়েছে তা যেমন পর্যাপ্ত নয় তেমনি ত্রান বিতরন নিয়ে অনিয়ম  ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ আসছে। এমনকি সরকারী দলের লোকজন ত্রান আত্মসাৎ করার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।
এদিকে খাদ্য সংকটের কারনে ত্রান পাওয়ার আশায় বিভিন্ন জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে এবং সিটি করর্পোরেশনের হট লাইনগুলোতে  এখনে ভুক্তভোগীদের ফোনের পর ফোন। যে পরিমান কল হট লাইনে আসছে সে পরিমান ত্রান বরাদ্দ নেই। তবে জেলা প্রশাসন থেকে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে তালিকা ধরে কিছু ত্রান বিতরন করা হচ্ছে  যেটা খুবই যৎ সামান্য। ফলে একটা ওয়ার্ডে ৫ হাজার লোকের বসবাস হলে সেখানে ত্রান দেয়া হচ্ছে মাত্র ৫০ থেকে ১ শ জনকে। অথচ প্রতিটি ওয়ার্ডে রয়েছে প্রায় হাজার খানেক অসহায় মানুষ। তবে ইতোমধ্যে লকডাউন ভেঙ্গে নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন স্থানে রাস্তায় নেমেছে ভুক্তভোগী মানুষেরা। নারায়ণগঞ্জে বিভিন্ন এলাকায় ত্রানের দাবীতের স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের বাসভবন কিংবা কার্যালয় ঘোরাও করার ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া গাজিপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় রাস্তায় নেমেছে গার্মেন্টস শ্রমিকরা।
জানা যায়,সরকারি নির্দেশনা মেনে বন্ধ আছে রাইডশেয়ার সার্ভিস প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম। এমনই একটি প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধিত গাড়িচালক সাব্বির আহম্মেদ। স্নাতক পাস এ যুবক গাড়ি চালিয়ে মেটাতেন পরিবারের খরচ। তবে রাইডশেয়ার সেবা বন্ধ থাকায় এখন কর্মহীন তিনি। আত্মসম্মান বোধের বিবেচনা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে ত্রাণ সংগ্রহ করতে না পারায় তার পরিবার খাদ্য সংকটের মুখোমুখি। ক্রমেই তীব্র হয়ে ওঠা এমন খাদ্য সংকটের মুখে রয়েছে দেশের অনানুষ্ঠানিক আয়ে নিযুক্ত প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ।
কর্মহীনদের খাদ্য সংকটের তীব্রতার চিত্র দেখা যাচ্ছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের খাদ্যসামগ্রী বিতরণ কর্মসূচির তথ্যেও। হটলাইন নম্বরের মাধ্যমে খাদ্যসামগ্রী বিতরণের ওই কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। মূলত গত ২৬ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত ১০ দিন সাধারণ ছুটির সময় থেকেই কর্মহীন হয়ে পড়ে রাজধানীর অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের কর্মজীবী মানুষ। ওই সময় কর্মহীন নিম্নবিত্ত, অসচ্ছল, অসহায় পরিবারের জন্য হটলাইন নম্বরের মাধ্যমে খাদ্যসামগ্রী বিতরণের জন্য গত ২৯ মার্চ কর্মসূচি চালু করে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। তাদের কভিড-১৯ নিয়ন্ত্রণ সেলের তথ্য বলছে, প্রথম দিনেই খাদ্যসমাগ্রীর জন্য তাদের হটলাইনে ফোন করে ১৯ জন। পরদিন ৩০ মার্চ তীব্র খাদ্য সংকটের কথা জানিয়ে হটলাইনে ফোন করে ১৩২ জন। ৩১ মার্চ খাদ্য সংকটের কথা জানিয়ে ডিএসসিসির হটলাইন নম্বরে ফোন করে ১৩৬ জন।
দ্বিতীয় দফায় সাধারণ ছুটির মেয়াদ বাড়ানোয় ঢাকার কর্মহীনদের খাদ্য সংকট তীব্র হতে শুরু করে। ১ এপ্রিল ডিএসসিসির কভিড-১৯ সেলে ফোন করে ঘরে খাবার না থাকার কথা জানায় ২১৭ জন। পরদিন ৩০২ জন ফোন করে খাদ্য সংকটের কথা জানায়। ৩ এপ্রিল এক লাফে ঢাকা দক্ষিণে খাদ্য সংকটের পড়া কর্মহীন ঢাকাবাসীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ২৬৮। তারা ডিএসসিসির হটলাইন নম্বরে ফোন করে ঘরে খাবার শেষ হয়ে যাওয়ার তথ্য জানায়।
ডিএসসিসির হটলাইন নম্বরে ফোন করে ৪ এপ্রিল ঘরে খাবার না থাকার কথা জানায় নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণে কর্মহীন হয়ে পড়া ১ হাজার ৪৭২ জন। পরদিন খাদ্য সংকটের কথা জানিয়ে ফোন করে ১ হাজার ৩০২ জন। ৬ এপ্রিল ঢাকার কর্মহীনদের খাদ্য সংকট আরো তীব্র হয়। এদিন ঘরে খাবার শেষ হওয়ার কথা জানিয়ে ডিএসসিসির হটলাইনে ফোন করে ১ হাজার ৫৮৩ জন। পরদিন খাদ্য সংকটে পড়াদের সংখ্যা এক লাফে ১৩৮ জন বেড়ে যায়। ওইদিন হটলাইনে খাদ্যসামগ্রী চেয়ে ফোন করে ১ হাজার ৭২১ জন। ১০ ও ১১ এপ্রিল শুক্র ও শনিবার হওয়ায় ১২ এপ্রিল থেকে কর্মদিবস পালন করার কথা ছিল। কিন্তু তৃতীয় দফায় ১২ ও ১৩ এপ্রিল সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়। আর ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখ সরকারি ছুটি থাকায় সাধারণ ছুটির মেয়াদ বেড়ে ১৪ এপ্রিল থেকে ২৪ এপ্রিল পর্যন্ত হয়। সাধারণ ছুটি দীর্ঘ হওয়ার সঙ্গে বাড়তে থাকে ঢাকায় কর্মহীনদের খাদ্য সংকট। ৮ এপ্রিল ডিএসসিসির হটলাইনে ফোন করে ঘরে খাবার না থাকার কথা জানায় ২ হাজার ২২ জন।
ঢাকা দক্ষিণ সিটির পাশাপাশি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনও (ডিএনসিসি) কর্মহীন নিম্নবিত্তদের জন্য হটলাইন সেবা চালু করেছে। ৯ এপ্রিল তাদের এ সেবা চালু হয়। ওইদিনই ডিএনসিসির হটালাইনে ফোন করে খাদ্য সংকটের কথা জানায় ১২৯ জন। পরদিন ৩৪৮ জন ফোন করে তীব্র খাদ্য সংকটের কথা জানায় ডিএনসিসির দুটি হটলাইনে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ  বলেন, দেশে নিয়মিত বেতনভিত্তিক পেশার বাইরে পাঁচ কোটি মানুষ রয়েছে, যাদের সংসার দৈনিক উপার্জনের অর্থে চলে। নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতিতে এ মানুষগুলো কর্মহীন হয়ে পড়েছে। তাদের ঘরে যে অর্থ ছিল, তাতে হয়তো দুই-পাঁচদিন চলার মতো। সরকারের উচিত ছিল আগে থেকেই এসব মানুষের কথা ভাবা। প্রয়োজনে দেশের বিভিন্ন সংস্থা রয়েছে, এনজিও রয়েছে, তাদের সঙ্গে বসে একটি কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের মাধ্যমে কর্মহীন হয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য অন্তত আশ্রয়, খাবার ও হাসপাতালের ব্যবস্থা করা।
সংকট উত্তরণের পথ হিসেবে তিনি বলেন, সরকারকে এখন দ্রæত কর্মহীনদের তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। সেটা হতে পারে জাতীয় পরিচয়পত্রের ডাটার ভিত্তিতে। পরে ওই কর্মহীনদের মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে দ্রæত নগদ অর্থ পাঠানো। পাশাপাশি এসব মোবাইল ব্যাংকিং কর্তৃপক্ষকেও একটা দায়িত্ব নিতে হবে। সার্ভিস চার্জ ছাড়া কোনো প্রকার ইন্টারেস্টবিহীন এ অর্থ লেনদেনের সুযোগ করে দিতে হবে। তা না হলে করোনায় আক্রান্ত হওয়ার আগে না খেয়েই দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ মারা যেতে পারে।
এদিকে নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর কভিড-১৯-এর প্রভাব নিয়ে সম্প্রতি যৌথ গবেষণা কার্যক্রম সম্পন্ন করেছে ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বি আইজিডি) ও পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি)। এসব মানুষের খাদ্য সংকটের বিষয়ে জানতে চাইলে বি আইজিডির নির্বাহী পরিচালক ইমরান মতিন  বলেন, এখন দ্রæততম সময়ের মধ্যে ইনকাম সাপোর্ট কর্মসূচি নিতে হবে। মানুষের উপার্জন ৭০ শতাংশ কমেছে, ভোগও কমে যাবে। এ সংকট মোকাবেলায় এরই মধ্যে সরকার একটি প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। সেটি কীভাবে বাস্তবায়ন হবে, তা নিয়ে কাজ করতে হবে। কে পাবে, কে পাবে না, এটা ভাবার সময় এখন না। স্বাস্থ্য ও আর্থিক বিষয়টি আগে নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, যেভাবে ত্রাণ বিতরণ করা হচ্ছে, সেটা আসলে খুব একটা নিরাপদ পদ্ধতিতে হচ্ছে না। এতে অরো বেশি মানুষ আক্রান্ত হওয়ার শঙ্কা তৈরি হচ্ছে। এ অবস্থায় নগদ অর্থ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। মোবাইল ব্যাংকিং চালুর মধ্য দিয়ে খাদ্য সংকটে থাকা কর্মহীনদের কাছে টাকা পৌঁছাতে হবে। তবে এখানে আরেকটি বিষয় ভাবতে হবে যে এতগুলো টাকা যখন ক্যাশ আউট হবে, অর্থের প্রবাহও ঠিক রাখতে হবে। তাছাড়া এজেন্ট পয়েন্টগুলোও সচল।