পরমাণু বিজ্ঞানী ড. এম. এ ওয়াজেদ মিয়া ও আমি

640

।। এম আখতার হোসেন।।

৯’মে ২০২০ ইং স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর জ্যেষ্ঠ জামাতা উপমহাদেশের প্রখ্যাত পরমাণু বিজ্ঞানী, বিশিষ্ট বিজ্ঞান ও শিশু সংগঠক ড. এম. এ ওয়াজেদ মিয়ার ১১ তম মৃত্যু বার্ষিকী। ২০০৯ সালের ৯মে ঢাকা স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। ১৯৪২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারী তিনি রংপুর জেলার, পীরগঞ্জ উপজেলার ফতেপুর গ্রামে এক অত্যন্ত সম্ভান্ত্র মুসলিম “মিয়া ” পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। চার ভাই ও তিন বোনের মধ্যে তিনি সর্বকনিষ্ঠ। তাঁর শৈশব নাম ছিল “সুধা” মিয়া, সেই নাম থেকেই ধানমন্ডি-৫ এ-র নিজ বাড়িটির নাম করন করা হয়েছে “সুধা সদন”। পিতা মরহুম আবদুল কাদের ছিলেন একজন অত্যন্ত বিনয়ী ও ধর্মপ্রাণ মানুষ। মা মরহুম বেগম ময়মান নেছা ছিলেন গৃহিণী, ধর্মপরায়ণ আদর্শ স্নেহময়ী মহীয়সী নারী। ড. ওয়াজেদ মিয়া ছোট বেলা থেকেই অত্যান্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন এবং মাত্র ১৪ বছর বয়সেই ১৯৫৬ সালে মেট্রিকুলেশন পরীক্ষায় (অংকে ডিসটিংকশনসহ) কৃতিত্বের সাথে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। ১৯৫৮ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে আই এস সি পরীক্ষায় ( অংকে পদার্থ বিজ্ঞান ও রসায়নে ডিসটিংকশনসহ) প্রথম বিভাগে মেধা তালিকায় দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে উত্তীর্ণ হন। অতঃপর দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপিঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান সম্মান (অনার্স) শ্রেণীতে ভর্তি হন এবং ঢাকা হলের (ফজলুর হক হল) আবাসিক ছাত্র হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা আরম্ভ করেন। সে সময় ঢাকাসহ সারাদেশেই রাজনৈতিক আন্দোলনের পাশাপাশি ছাত্র আন্দোলন দানা বেধে উঠে।ইতিমধ্যে তিনি ছাত্রলীগে যোগদান করলে তাঁকে ঢাকা হল( ফজলুল হক হল) শাখার ছাত্রলীগের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। সে সময় শিক্ষা কমিশনের বিরুদ্ধে ছাত্রদের বিভিন্ন দাবির জন্য ছাত্র আন্দোলন শুরু হলে, অন্যদের সঙ্গে তিনিও গ্রেফতার হন এবং ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে কয়েকমাস বন্দী থাকা অবস্থায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে পরিচিত হন এবং বঙ্গবন্ধু তাঁর সম্পর্কে অবগত হন। বন্দী অবস্থা থেকে মুক্তি পেয়ে ড. ওয়াজেদ মিয়া ছাত্র আন্দোলনের পাশাপাশি পড়াশোনায় আত্মনিয়োগ করেন এবং ১৯৬১ সালে প্রথম শ্রেণীতে (অংকে ডিসটিংকশনসহ) মেধা তালিকায় দ্বিতীয় স্থান দখল করে স্নাতক (সম্মান) ডিগ্রি অর্জন করেন। ছাত্র রাজনীতির সাথে যুক্ত থেকেও তিনি বিরতিহীনভাবে ১৯৬২ সালে এম এসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে প্রথম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হন। অতঃপর তিনি ( ১৯৬৩ সালের ১লা এপ্রিল) পাকিস্তান আনবিক শক্তি কমিশনে বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা পদে যোগদান করেন। কয়েকমাস লাহোরে প্রশিক্ষণে থাকা অবস্থায় বৃত্তি নিয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য লন্ডনস্থ ইম্পেরিয়েল কলেজে ভর্তি হন এবং ১৯৬৪ সালে ওই কলেজ থেকে প্রথম বিভাগে এম এস ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৬৭ সালে ইংল্যান্ডের দারহাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সাথে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। দেশে ফিরে পাকিস্তান আনবিক শক্তি কমিশনের অধীনে আনবিক শক্তি কেন্দ্র, ঢাকায় উর্ধতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা হিসেবে কাজে যোগদান করেন এবং ১৯৬৮ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জ্যেষ্ঠ কন্যা বর্তমান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। উল্লেখ্য ওই সময় অর্থাৎ ১৯৬৬ সালের ৬ দফা এবং ১১ দফাসহ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় তখন আইয়ুব মোনায়েম সরকারের ষড়যন্ত্রে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় জেলখানায় বন্দী রাখা হয়।ড. এমএ ওয়াজেদ মিয়া ১৯৬৯ সালে ৬ মাসের জন্য ইতালিতে এবং নভেম্বর ১৯৬৯ থেকে নভেম্বর ১৯৭০ সাল পর্যন্ত ইংল্যান্ডে postdoctoral work in Nuclear Physics এর ওপর উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। ওই রাতেই পাকিস্তানি সৈন্যরা বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে। ইতোমধ্যে বঙ্গবন্ধুর বড় পুত্র শেখ কামাল ও মেঝ পুত্র শেখ জামাল, বাংলাদেশকে শত্রু মুক্ত করতে বাংলার দামাল ছেলেদের সাথে মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণের জন্য ঢাকা ত্যাগ করেন। উল্লেখ্য, এ সময় জননেত্রী শেখ হাসিনা সন্তান সম্ভবা ছিলেন। এমতাবস্থায় ড. এমএ ওয়াজেদ মিয়াই ছিলেন জননেত্রী শেখ হাসিনা, বেগম ফজিলাতুন নেসা মুজিব, শেখ রেহেনা, ৭ বছরের শিশু শেখ রাসেলের ভরসার স্থল। ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া বঙ্গবন্ধুর ভবন ত্যাগ করে ধানমন্ডি ৮ নং সড়কের বঙ্গবন্ধুর এক হিতাকাঙ্ক্ষীর বাসায় সবাইকে নিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করেন। ১৯৬৯ সালে ইতালির ত্রিয়ন্তিতে আন্তর্জাতিক তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র ড. ওয়াজেদ মিয়াকে ৬ বছরের জন্য গবেষক হিসেবে নিয়োগ দেয়ার প্রস্তাব করেন পাকিস্তানের নোবেল বিজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম। ওই বছরের ১২ এপ্রিল সস্ত্রীক ইতালি যান ড. এমএ ওয়াজেদ মিয়া। কিন্তু ৭ মাস পরই দেশে ফিরে আসেন। ১৯৭৩ সালে যুক্তরাজ্যে ডায়েমবেরি নিউক্লিয়ার গবেষণা কেন্দ্রে হাই অ্যানার্জি পার্টিকেল ফিজিক্স নিয়ে উচ্চতর গবেষণা করেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যখন স্ব-পরিবারে নৃশংস ভাবে হত্যা কান্ডের শিকার হন, তখন ড. এমএ ওয়াজেদ মিয়া স্ত্রী সন্তানসহ পশ্চিম জার্মানিতে ছিলেন পদার্থবিজ্ঞানে উচ্চতর গবেষণার জন্য। এছাড়াও ড. এমএ ওয়াজেদ মিয়া পশ্চিম জার্মানির কার্স্লরূয়ে পরমাণু গবেষণা কেন্দ্রে চুল্লিতত্ত্ব ও চুল্লি প্রকৌশল বিষয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। উল্লেখ্য, তিনি চুল্লি পরিচালনা, স্বাস্থ্য পদার্থবিদ্যা ও সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান, চুল্লি নিরাপত্তা রক্ষা এবং চুল্লি উপকরণ ব্যবস্থাপনা ও পদ্ধতি বিশ্লেষণের উপরও প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। ১৯৭২ সালের শেষ পর্যায়ে ইন্টারকন্টিনেন্টালে এক বিজ্ঞান সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় এবং এতে প্রধান অতিথি ছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সম্মেলনে সিদ্ধান্ত হয়, সদ্য স্বাধীনতা প্রাপ্ত যুদ্ধ বিধ্বস্ত বাংলাদেশে আনবিক শক্তি কমিশনের মতো একটি ব্যায় বহুল সংস্থা আলাদা ভাবে না রেখে ড. কুদরত-ই-খুদা কতৃক প্রতিষ্ঠিত সায়েন্স ল্যাবরেটরির সঙ্গে একত্রিত হয়ে কাজ করাই সমীচীন হবে। কিন্তু ড. এমএ ওয়াজেদ মিয়া নাছোড়বান্দার ন্যায় পরদিন সকালে তখনকার আনবিক শক্তিকমিশনের ভারপ্রাপ্ত প্রধান ড. আনোয়ার হোসেন কে নিয়ে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং বাংলাদেশে আনবিক শক্তিকমিশনের যথার্থতা বোঝাতে সক্ষম হন। পরবর্তী ১৯৭৩ সালে মহামান্য রাষ্টপতির আদেশ বলে বাংলাদেশ আনবিক শক্তিকমিশন গঠিত হয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশে পরমাণু শক্তি কমিশন প্রতিষ্ঠায় ড. এমএ ওয়াজেদ মিয়ার অবদান সর্বজন স্বীকৃত। ড. এমএ ওয়াজেদ মিয়া দেশের অভ্যন্তরে কমিশনের প্রধান কার্যালয়ে তেজস্ক্রিয়তার ঝুঁকি কমানোর জন্য পারমাণবিক নিরাপত্তা ও বিকিরণ নিয়ন্ত্রণ (পানিবিনি) বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করার পর ছাত্রদল নেতারা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে আনবিক শক্তি কেন্দ্রকে অন্যত্র সরিয়ে দেয়ার জন্য সরকারের উপর চাপসৃষ্টি করে এবং ঐ স্থানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য আবাসিক হল স্থাপনের ঘোষণা দেন। বিএনপি সরকার ওই প্রতিষ্ঠানটিকে সরানোর নির্দেশ দিলে কমিশনের বিজ্ঞানীদের মধ্যে একমাত্র ড. এমএ ওয়াজেদ মিয়াই প্রকাশ্যে এর বিরোধিতা করেন, যার ফলে ওই প্রতিষ্ঠানটি এখনো ওই স্থানে ( বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস) বহাল অবস্থায় গবেষণা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। ১৯৯৩ সালে যখন পরমাণু শক্তি কেন্দ্রকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে হস্তান্তরের কথা উঠেছিল তখনও তিনি তাঁর ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা দিয়ে সে প্রক্রিয়াকে বন্ধ করতে সমর্থ হয়েছিলেন। ড. এমএ ওয়াজেদ মিয়া বিজ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে গবেষণা মুলুক লেখার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানী স্বীকৃতি অর্জন করায় সরকার ১৯৯৭ সালে তাঁকে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের চেয়ারম্যান হিসাবে নিয়োগ প্রদান করেন এবং তিনি কমিশনের পঞ্চম চেয়ারম্যান হিসাবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। ১৯৯৯ সালে কমিশনের চেয়ারম্যান থাকাকালে তিনি চাকুরী থেকে অবসর গ্রহণ করেন। কমিশনে চাকুরীতে থাকা কালীন সময়ে ড. এমএ ওয়াজেদ মিয়া আনবিক শক্তি কমিশনের অধীনে RTI অর্থাৎ Radiation Testing Laboratory নামে চট্রগ্রামে একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন এবং তাতে বাংলাদেশর যতপ্রকার খাদ্যদ্রব্য(দুধসহ) আমদানি হতো সব দ্রব্যাদি ওই গবেষণা গারের ছাড়পত্র ছাড়া বাজারজাত করা নিষিদ্ধ করা হয়। বর্তমানে ওই প্রতিষ্ঠানটি Radioactivity Testing and Monitoring Laboratory নামে চট্রগ্রামে কার্যকর রয়েছে। এছাড়াও ড. এমএ ওয়াজেদ মিয়ার কর্মময় জীবনের গবেষণার ফসল নিয়ে বিশদ ব্যাখ্যা করতে শহশ্রাধিক পৃষ্ঠায়ও শেষ হবার নয়। ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্ট দুঃসহ সেই দিনটি শিরোনামে লেখার একটি অংশে ড. এমএ ওয়াজেদ মিয়া বলেন অতঃপর ভারতীয় ঐ অফিসিয়ালের সঙ্গে আমি তাঁদের রাষ্টদূতের বাসায় যাই। তখন ভারতীয় রাষ্টদূত ছিলেন এক মুসলমান জার্নালিস্ট । একটু ভয়ে ভয়ে আমাদের বিপর্যয়ের কথা আমি তাঁকে বিস্তারিত ভাবে বর্ণনা করি। আমার কথা শোনার পরে তিনি আমাকে লিখে দিতে বলেন যে, আমরা ভারতীয় সরকারের কাছ থেকে কি চাই। অতঃপর তিনি সাদা কাগজ ও একটি কলম আমায় হাতে তুলে দেন। তখন মানসিক দুশ্চিন্তা ও অজানা শঙ্কায় আমার হাত কাঁপছিল। যা হোক, অতি কষ্টে রেহানা সহ আমার পরিবার বর্গের নাম উল্লেখ পূর্বক সকলের পক্ষ থেকে আমি লিখলাম, শ্যালিকা রেহানা, স্ত্রী হাসিনা, শিশু ছেলে জয়,শিশু মেয়ে পুতলি এবং আমার নিজের কেবলমাত্র ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও প্রাণ রক্ষার জন্য ভারত সরকারের নিকট কামনা করি রাজনৈতিক আশ্রয়। ড. এমএ ওয়াজেদ মিয়া বঙ্গবন্ধু স্ব-পরিবারে হত্যার শিকার হবার পর দীর্ঘদিন এই পরিবারকে নিয়ে ভারতে মানবেতর জীবনযাপন করেন।ড. এমএ ওয়াজেদ মিয়ার অন্য আরেকটি লেখনি থেকে পাওয়া যায় একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ধানমন্ডির ১৮ নম্বর (নতুন ৯/এ) সড়কের ২৬ নম্বর বাড়িতে বন্দি ছিলেন শেখ হাসিনা ও ড. এমএ ওয়াজেদ মিয়া, সেখানেই তাদের প্রথম সন্তান জয়ের জন্ম হয় ২৭ জুলাই রাত ৮টায় নির্ধারিত সময়ের সপ্তাহ খানেক আগে। উৎফুল্ল শেখ হাসিনা তখন বলে, আব্বা আমাকে বলেছিলেন ছেলে হলে জয় অর্থাৎ বাংলার জয় এবং মেয়ে হলে জয়া নাম রাখতে। আমার শাশুড়ী, বেগম মুজিব তাই ছেলেকে কোলে নিয়ে বললেন, সত্যিই এই আমার জয়। আমার কোন ভাই নাই, জয় আমার ভাই। মুজিব নামের সঙ্গে মিলিয়ে ওর আসল নাম রাখলাম সজীব। এই নাম শোনার পর পাকিস্তানের উর্ধতন কমান্ডাররা আমাকে জিজ্ঞেস করল, ” জয় নাম কিসলিয়ে রাখা ” আমি তাদের বুঝাই যে, নাতিকে পেয়ে শাশুড়ি খুব খুশি হয়েছেন, যেহেতু জয় মানে আনন্দ, তাই জয় নাম রেখেছেন। ড. এমএ ওয়াজেদ মিয়া ১৯৭২-১৯৭৩ বাংলাদেশ আনবিক শক্তি বিজ্ঞানী সংঘের সাধারণ সম্পাদক, ১৯৮৩-৮৫ বাংলাদেশ আনবিক শক্তি বিজ্ঞানী সংঘের সভাপতি দুই টার্ম, ১৯৮৫-৮৮ বাংলাদেশ পদার্থবিজ্ঞান সমিতির সাধারণ সম্পাদক দুই টার্ম, বাংলাদেশ পদার্থবিজ্ঞান সমিতির সভাপতি ১৯৮৭-১৯৯০ দুই টার্ম, ১৯৯১-১৯৯২ বাংলাদেশ আনবিক শক্তি বিজ্ঞানী সংঘের সভাপতি, ১৯৮৯-৯৩ বাংলাদেশ বিজ্ঞানী ও বিজ্ঞানজীবি সমিতির সভাপতি তিন টার্ম। ১৯৯৪-১৯৯৬ বাংলাদেশ বিজ্ঞান উন্নয়ন সমিতির সিনিয়র সহ-সভাপতি দুই টার্ম, ১৯৯৪-১৯৯৭ রংপুর জেলা সমিতি ঢাকা, সভাপতি, ২০০৪-০৯ বৃহত্তর রংপুর কল্যান সমিতি ঢাকার সভাপতি, প্রতিষ্ঠার পর ১৯৯৪ থেকে ২০০৩ এর মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত জাতীয় শিশু অধিকার সংগঠন শেখ রাসেল শিশু সংসদের প্রধান উপদেষ্টা ও ২০০৩-২০০৯ পর্যন্ত সভাপতি। (উল্লেখ্য ১৯৯৪ সালের ১০ জানুয়ারীর পূর্বে সংগঠনটির প্রতিষ্ঠা কালীন প্রথম সভায় ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া সভাপতিত্ব করেন এবং তাঁরই নির্দেশনায় সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা করা হয়)। এছাড়াও অনেক সংগঠনের তিনি প্রধান উপদেষ্টা ও সভাপতি ছিলেন। ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়ার লেখা কয়েকটি বই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে পাঠ্য বই হিসেবে পড়ানো হয়। আমার সাথে বিশিষ্ট এই রাষ্ট্রব্যক্তিত্ব পরমাণু বিজ্ঞানী ড. এমএ ওয়াজেদ মিয়ার প্রথম সাক্ষাত হয় ১৯৯৩ সালের আগস্ট মাসে। ৮নং বঙ্গবন্ধু এভিনিউ, ঢাকা -১০০০,তৃতীয় তলায়। গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাধনা সংসদের এক মিটিংএ। আমি নারায়ণগঞ্জ থেকে অধ্যাপিকা নাজমা রহমান আপার সাথে ওই মিটিংএ যোগদান করি। প্রথম দেখাতেই আমার মনে হলো দেখতেই এমন, আসলে কত বড় মাপের মানুষ তিনি আল্লাহ্ পাকই জানেন। সুযোগ করে পা ছুয়ে সালাম করি, তিনি (ড. এমএ ওয়াজেদ মিয়া) হাসি দিয়ে আমার মাথায় হাত ভূলিয়ে দেন। পরবর্তীতে সাধনা সংসদের প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব বীর মুক্তিযোদ্ধা এডভোকেট দেলোয়ার হোসেন ভূইয়ার মাধ্যমে আমার এক বন্ধুকে নিয়ে পরমাণু শক্তি কমিশন কেন্দ্রে ড. এমএ ওয়াজেদ মিয়ার সাথে সাক্ষাত করি এবং আলাপ আলোচনা শেষে শহীদ শিশু শেখ রাসেলের নামে একটি সংগঠন গড়ার প্রস্তুতি নিতে ফাইনাল হয়। আমার মনে হলো এই বুঝি আমার সপ্নের শিখরে যাওয়ার একটি দার আল্লাহপাক খুলে দিলেন। ১৯৮৮ সালে স্বারাদেশ বন্যয় প্লাবিত। আমি বন্দর উপজেলার ঐতিহ্য বাহী বিদ্যাপিঠ বর্তমান ঢাকেশ্বরী মিলস্ স্কুল এন্ড কলেজর ৮ম শ্রেণীর ছাত্র এবং বিদ্যালয়ের বয়স্কাউট লিডার। স্কাউটদের পক্ষ থেকে বিদ্যালয়ের আশ্রয় নেয়া মানুষের জন্য বিভিন্ন স্থান থেকে ত্রান সংগ্রহের কাজ শেষ করে বিদ্যালয়ের স্কাউট রুমে গিয়ে অবস্থান নেয়ার পরপরই শুনতে পেলাম আশ্রয় কেন্দ্রে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর জ্যেষ্ঠ কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা এসেছেন, আমি আমার কাজ তারা হুরো করে শেষ করে সপ্নের নেত্রীকে দেখতে সেখানে ছুটে যাই। বিদ্যালয়ের স্কাউট লিডার থাকার কারণে ঐ সময় নেত্রীর চতুর পাশ গিরে থাকা আমাদের এলাকার ছাত্রলীগের নেতা কর্মীরা আমাকে সামনে যেতে বাধা সৃষ্টি করেনি, নেত্রী আমাকে দেখে হাসিমুখে আদর করলেন, কিছু সময় আমি সবার সাথে থাকলাম এবং পাশেই উত্তর লক্ষন খোলা সরকারী প্রাথমিক স্কুলের আশ্রয় কেন্দ্রে নেত্রীর সাথে সাথে গেলাম। আমি তখন পর্যন্ত রাজনীতির অ,আ,ক,খ অতটা বুঝি না।মনে হলো এটাই আমার রাজনৈতিক প্রাথমিক দর্শন। আমার মনে বঙ্গবন্ধুর জন্ম হলো। ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়ার সাথে প্রথম সাক্ষাতেই ভাবতে ছিলাম আমি যদি বঙ্গবন্ধু পরিবারের সৈনিক হতে পারতাম, আর সেই পথ সুগম করে দিলেন আমাকে ড. এমএ ওয়াজেদ মিয়া। ১৯৯৪ সালের ১০ জানুয়ারী কাগজে পত্রে তিনি বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক প্রশ্নে শিশু অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা মাথার এনে তাঁর কনিষ্ঠ শ্যালক শহীদ শিশু শেখ রাসেলের নামে শেখ রাসেল শিশু সংসদের অগ্রযাত্রা শুরু করেন। ১৯৯৬ সালের ১৩ই আগস্ট একটি জাতীয় সেমিনারে ড. এমএ ওয়াজেদ মিয়া সংগঠনটি জাতীয় ভাবে স্বারাদেশে অগ্রসর করে নিয়ে যাওয়ার জন্য ঐ অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি তৎকালীন মাননীয় যুব ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী ও বর্তমান বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক মাননীয় সেতু মন্ত্রী জনাব ওবায়দুল কাদেরের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। পরর্বতী ২০০৩ সালের ১৮ অক্টোবর ধানমন্ডি ৩২ নং বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরের সামনে বঙ্গবন্ধু, শেখ রাসল ও বঙ্গবন্ধুর সপরিবারের খুনীদের ফাসির রায় দ্রুত কার্যকর করার দাবীতে ( রাজনৈতিক নানা বৈরি পরিবেশ উপেক্ষা করে) শেখ রাসল শিশু সংসদের পক্ষ থেকে গন অনশন কর্মসূচিতে মাননীয় সেতু মন্ত্রী জনাব ওবায়দুল কাদের উপস্থিত ছিলেন, জননেত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে ওই অনুষ্ঠানে সাবেক পররাষ্ট্র মন্ত্রী ও তৎকালীন আওয়ামীলীগের জ্যেষ্ঠ প্রেসিডিয়াম সদস্য জনাব আবদুস সামাদ আজাদ এমপি প্রধান অতিথির বক্তব্য শেষ করে দুপুর দেড়টায় অনশণ রত ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়াকে পানি পান করিয়ে (আওয়ামীলীগ সরকার পরর্বতী সময় ক্ষমতায় আসার পর বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচারের রায় দ্রুত কার্যকর করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে) অনশন ভাঙ্গেন। এরপর ২০০৬ সালের ২০ মার্চ একই স্থানে বঙ্গবন্ধুর জন্ম বার্ষিকী ও জাতীয় শিশু দিবস উপলক্ষে ড. এমএ ওয়াজেদ মিয়ার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সংগঠনের আলোচনা সভায় তৎকালীন আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক জনাব ওবায়দুল কাদের এমপি বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন,অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সাবেক মহামান্য রাস্ট্রপতি তৎকালীন আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মো. জিল্লুর রহমান এমপি। সংগঠনের পক্ষ থেকে একাধিক বার জননেত্রী শেখ হাসিনার সাথে আমার সাক্ষাতের সুযোগ হলেও সংসদের পক্ষ থেকে ২০০৪ সালের ১৮ অক্টোবর শেখ রাসেলের ৪০ তম জন্ম বার্ষিকী উপলক্ষে ধানমন্ডি বঙ্গবন্ধু জাদুঘরের সামনে ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়ার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভা ও ইফতার অনুষ্ঠানে তৎকালীন জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন জননেত্রী শেখ হাসিনা অংশ গ্রহণ করলে, এই সংগঠনকে এগিয়ে নেয়ার জন্য আমাকে আরোও দিগুণ হারে অনুপ্রাণিত করে তুলে। ২০০৯ সালের ৯ মে ড. এমএ ওয়াজেদ মিয়া মৃত্যু বরন করলে এক বছরের মাথায় সংগঠনের পক্ষ থেকে আমরা ড. এমএ ওয়াজেদ মিয়ার জীবন কর্মকে পৃথিবী ব্যাপি ছরিয়ে দেয়ার লক্ষে ড. এমএ ওয়াজেদ মিয়ার নামে একটি ওয়েব সাইট চালু করার সিদ্ধান্ত নেই এবং তা পরবর্তী সময় তৎকালীন মাননীয় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এড. শামছুল হক টুকু এমপিকে দিয়ে ওয়েবসাইটটির অনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করাই।গতবছর বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর আয়োজিত ড. এমএ ওয়াজেদ মিয়া বাংলাদেশের আধুনিক পরমাণু বিজ্ঞানের প্রাণ পুরুষ শীর্ষক সেমিনার- ২০১৯, ২০ মার্চ প্রকাশিত ৩২ পৃষ্ঠার বইতে ড. এমএ ওয়াজেদ মিয়ার সংক্ষিপ্ত সাংগঠনিক পরিচিতিতে তিনি যে শেখ রাসেল শিশু সংসদের সভাপতি ছিলেন তা তুলে ধরায় আমি বাংলাদেশ জাদুঘরের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি কৃতজ্ঞ।

ড. এমএ ওয়াজেদ মিয়া আমাকে অত্যান্ত পছন্দ করতেন, বিশ্বস্থ ভাবতেন, আমিও সেই বিশ্বাসের চুল চারানাড়ও ব্যতিক্রম করেনি। আমি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শকে লালন করে সংগঠনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। অনেকে সংগঠনের কার্যক্রমকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ত হয়েছেন আবার চলেও গেছেন কিন্তু ড. এমএ ওয়াজেদ মিয়া ও আমি হাল ধরে রেখেছিলাম । জীবদ্দশায় ড. এমএ ওয়াজেদ মিয়া সংগঠনের একটি স্থায়ী কার্যালয়ের জন্য অনেক বিত্তবানদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতায় তা হয়ে উঠেনি । রোদ বৃষ্টি উপেক্ষা করে সংগঠনটিকে ধরে রেখেছি । এই সংগঠন করার কারনে ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর ৩ মাস ফেরারী আসামির মতো মানবেতর জীবনযাপন করেছি। তৎসময় আমার মালিকানাধীন ফ্যাক্টরীতে বোমা মারা হয়েছে, থানা পুলিশের কোনো সহযোগীতাও পাইনি। তারপরও মনে করি বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সৈনিক হতে পেরেছি কিনা জানি না।

লেখক: এম আখতার হোসেন, প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক, শেখ রাসেল শিশু সংসদ ও নারায়ণগঞ্জ সাংবাদিক উন্নয়ন ফোরাম, সদস্য, বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০১৮ পরিচালনা পেশাজীবি সমন্বয় উপকমিটি, বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ,প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, আব্দুস সোবহান এন্ড আরফাতুন নেছা ফাউন্ডেশন ও বেডেন পাওয়েল স্পোর্টস ক্লাব।