পিএইচডি স্কলারশীপ পেলে মিষ্টি খাওয়াবো !

148

এহসানুল হক জসীম, সাংবাদিক ও গবেষক : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা বাজেট যে খুবই অপ্রতুল, নতুন কথা কি? বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ যেখানে জ্ঞান সৃষ্টি করা, সেখানে আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো জ্ঞান মুখস্থ করাচ্ছে। জ্ঞান সৃষ্টির কাজ হয় গবেষণায়। আমাদের দেশের গবেষণা বাজেট দেখলেই সহজেই অনুমেয়, কী পরিমাণ জ্ঞান ‍সৃষ্টি হচ্ছে….

একাডেমিক রেজাল্টের উপর ভিত্তি করে এমফিল/পিএইচডির স্কলারশীপ দেওয়া হয় ঢাবিতে। গেল সপ্তাহে কথা বললাম সংশ্লিষ্টদের সাথে। আমার রেজাল্ট খুব চমৎকার না ঠিকই; তবে পিএইচডি স্কলারশিপের জন্য মনোনীত হতেও পারি। বললেন, ‘আপনি হয়তো স্কলারশীপ এর জন্য মনোনীত হতে পারেন। তবে অপেক্ষা করতে হবে।’ জিগাইলাম, ‘কত দিন? আমার তো পিএইচডি শেষ হতে চলেছে।’ উল্লেখ্য, আমি ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের একজন পিএইচডি গবেষক। ’এই সেশনের স্কলারশীপ মনোয়ন বা প্রদানের প্রক্রিয়া যখন শুরু হবে ততদিনে আমার পিএইচডি গবেষণা হয়তো শেষ হয়ে যাবে। তখন স্কলারশীপ বা এর টাকা দিয়ে কি করবো?’ ডেপুটি রেজিস্টার বললেন, ‘দেখুন, আপনি যদি মনোনীত হন, আর তখন যদি আপনার ডিগ্রীও হয়ে যায়, তা-ও আপনার স্কলারশীপের টাকা আপনি পাবেনই। দুই কিস্তিতে পাবেন। ২০১৬-২০১৭ সেশনে যারা এমফিল, পিএইচডিতে ভর্তি হয়েছিল, তাদের বাছাই কাজ চলবে কিছুদিনের মধ্যে, শেষ হতে হয় ছয় মাস লাগবে। তারপর ২০১৭-১৮ সেশনে যারা ভর্তি হয়েছে, তাদের ফাইল বাছাই প্রক্রিয়ায় আসবে।’

আমার দেশে যারা এমফিল, পিএইচডিতে ভর্তি হয়, হাতে গুনা মাত্র কয়েকজনই স্কলারশীপ পায়। যে পরিমাণ পায়, সেটা তো খুবই পুওর, তা আর না বলি। এই এরাই যদি সেই স্কলারশীপ পায় ভর্তির ৪/৫ বছর পর, কিংবা ডিগ্রী প্রাপ্তির পর; কেমন হবে? ২০১৬-১৭ তে যারা এমফিল বা পিএইচডিতে ভর্তি হয়েছিলেন, তাদের কেউ কেউ ইতোমধ্যে ডিগ্রী পেয়ে গেছেন, কেউ কেউ ডিগ্রী পাওয়ার অপেক্ষায়; আর কিছু সংখ্যক হয়তো বাকি আছেন যাদের ডিগ্রী বা গবেষণা এখনো শেষ হয়নি। যাহোক, এই শিক্ষাবর্ষের যে কিছু সংখ্যক স্কলারশীপ পাবে; আচ্ছা, কী করবে তারা এই স্কলারশীপের টাকা দিয়ে? বাসায় কি নতুন ফ্রিজ কিনবে? নাকি সোফা কিনবে? নাকি বাইক কিনবে?

আমি যদি স্কলারশীপের জন্য মনোনীত হই ২০২২ সালে, কী করবো তখন? স্কলারশীপের টাকা দিয়ে কি তখন ডক্টরাল ডিগ্রী প্রাপ্তি সেলিব্রেট করবো? অবশ্য, আমার পিএইচডি স্কলারশীপ পাওয়ার সম্ভাবনা কম। যদি পেয়ে যাই, সেই টাকা যেহেতু গবেষণার কাজে লাগবে না; সেহেতু ডিগ্রী প্রাপ্তি সেলিব্রেট করবো এই টাকা দিয়ে। কথা দিলাম, আপনাদেরে প্রিমিয়াম, রস, বনফুল কিংবা বিক্রমপুরের মিষ্টি খাওয়াবো। না হয় নেত্রকোণার বালিশ মিষ্টি, নাটোরের কাঁচাগোল্লা, কুমিল্লার রসমালাই, পাবনার ইলিশপেটি কিংবা টাঙ্গাইলের চমচম খাওয়াবো।

ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি, বোম্বে এর ২০১৬-১৭ অর্থবছরের গবেষণার জন্য বরাদ্দ ছিল বাংলাদেশি টাকায় ৪৫৫ কোটি। সেখানে বাংলাদেশের সেরা প্রতিষ্ঠানের সে বছর ছিল ১৫ কোটি টাকা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা খাতে বরাদ্দ দিন দিন আরো কমাচ্ছে এবং অন্যান্য খাতে বাড়াচ্ছে। এই যেমন ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ঢাবির গবেষণায় বরাদ্দ ছিল ১৫ কোটি; ২০২০-২১ অর্থবছরে সেটা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১১ কোটি। চলতি অর্থবছরে ঢাবিতে ৮৩১ কোটি টাকার বাজেটে গবেষণায় বরাদ্দ মাত্র ১.৩২%। জাহাঙ্গিরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা খাতে বরাদ্দ ভিসির চা-নাস্তার বাজেটের চাইতে আরো কম থাকে। এখন বুঝুন গবেষণায় আমাদের অবস্থা। বাংলাদেশের অনেকেই স্কলারশীপ নিয়ে বিদেশে পিএইচডি করতে যায়। তারা কি গবেষণা শেষ হওয়ার পর স্কলারশীপের টাকা পায়? অন্যান্য দেশে কি স্কলারশীপ দেওয়া হয় গবেষণা সম্পন্ন হওয়ার পর?

স্কলারশীপের টাকা দেওয়া হয় সংশ্লিষ্ট গবেষকের গবেষণা সংক্রান্ত কাজে ব্যয় করার জন্য। সে যদি স্কলারশীপের জন্য মনোনীতই হয় তার গবেষণা সমপ্তির পর, তাহলে বুঝুন আমাদের দেশের পিএইচডি হবে কী রকম? এমফিল হবে কী রকম? আমাদের এখানকার গবেষণা হবে কী রকম? বিশ্ববিদ্যালয়েল গবেষণা সেক্টরের যদি হয় এই অবস্থা, তাহলে থিসিসের নামে বুক রিভিউ হবেই বেশির ভাগ ক্ষেত্রে। দু’একজন হয়তো এখানে ভালো মানের গবেষণা করে কিংবা ভালো মানের থিসিস তৈরী করে। বাদবাকি সবাই গতানুগতিক। এই গতানুগতিক গবেষণার জন্য দায়ী কে? গবেষক না কর্তৃপক্ষ? নাকি সিস্টেম? নাকি বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থা?