বিদ্যুতের তিন লাখ গ্রাহক বাড়ছে

625

মিরর বাংলাদেশ: সারাদেশে বিদ্যুৎ সংযোগ ছড়িয়ে দিতে নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ প্রকল্পের সংশোধনীতে সাড়ে তিন লাখেরও বেশি গ্রাহক বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে বাড়তি এসব গ্রাহকের জন্য প্রস্তাবনায় বাড়ানো হয়েছে বিতরণ লাইনের পরিমাণ ও উপকেন্দ্রের সংখ্যা, বাড়তি দেখানো হয়েছে বৈদ্যুতিক লাইন নির্মাণ কাজের ব্যয়। এর সঙ্গে যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামের পেছনে ব্যয়ও বাড়ানো হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে দুই বছর বেশি সময়ও চাওয়া হয়েছে। আর সবকিছু মিলিয়ে সংশোধিত প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে দেড় হাজার কোটি টাকারও বেশি।

‘শতভাগ পল্লী বিদ্যুতায়নের জন্য নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ’ শীর্ষক এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে বাস্তবায়নের কথা থাকলেও তা সম্ভব হয়নি। এখন মন্ত্রণালয় প্রকল্পের প্রথম সংশোধনী প্রস্তাব করেছে। এরই মধ্যে সে সংশোধনীর অনুমোদন প্রক্রিয়াও শেষ করেছে পরিকল্পনা কমিশন। পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে এই সংশোধনী উপস্থাপনের প্রস্তুতিও চূড়ান্ত করা হয়েছে।

প্রকল্পটির দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিকল্পনা কমিশনের শিল্প ও শক্তি বিভাগের সদস্য (সিনিয়র সচিব) সাহিন আহমেদ চৌধুরী সারাবাংলাকে বলেন, প্রকল্পটি সংশোধনের ফলে নতুন গড়ে ওঠা বসতবাড়ি এবং নদী ভাঙনের ফলে আশপাশের এলাকায় গড়ে ওঠা নতুন বসতিসহ বিভিন্ন চরাঞ্চলের অফগ্রিড এলাকাগুলোতেও নেটওয়ার্ক পৌঁছাবে। এতে করে বাড়তি ৩ লাখ ৬০ হাজার গ্রাহককে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া সম্ভব হবে। আর সেটা করতে গিয়েই প্রকল্পটির বিভিন্ন অংশের কাজের পরিমাণ ও ব্যয় প্রকৃত চাহিদার ভিত্তিতে বাড়িয়ে প্রকল্পটির ডিপিপি সংশোধন করা হয়েছে।

পরিকল্পনা কমিশনের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, প্রকল্পটি প্রস্তাব পাওয়ার পর ২০১৯ সালের ৫ ডিসেম্বর  প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় দেওয়া সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) পুনর্গঠন করা হয়েছে। ফলে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির পরবর্তী সভায় এই সংশোধনী উপস্থাপন করা হবে। অনুমোদন পেলে ২০২১ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, সরকারের ‘রূপকল্প ২০২১’ অনুযায়ী ২০২১ সালের মধ্যে সবার জন্য বিদ্যুৎ সেবা নিশ্চিত করতে ২০১৭ সালের ২০ জুন অনুষ্ঠিত একনেক সভায় বিদ্যুৎ নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের এই প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়। ওই সময় প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয় ৬ হাজার ৭৭৬ কোটি ৯১ লাখ টাকা। প্রকল্পটি ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে বাস্তবায়নের কথা ছিল।

নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পের কাজ শেষ না হওয়ায় বর্তমানে বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে সংশোধন প্রস্তাব তৈরি করা হয়। এতে প্রকল্পের ব্যয় অনুমোদিত ডিপিপির (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) চেয়ে বেশি ধরা হয়েছে ১ হাজার ৫৮৭ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। অনুমোদন পেলে প্রকল্পের নতুন ব্যয় দাঁড়াবে ৮ হাজার ৩৬৪ কোটি ৯১ লাখ টাকা। আর মেয়াদ দুই বছর বেড়ে যাওয়ায় ২০১৯ সালের ডিসেম্বরের পরিবর্তে ২০২১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মেয়াদ পাবে এই প্রকল্পটি।

প্রকল্পের মূল কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে— ৪৮ হাজার ২৫৫ কিলোমিটার নতুন বিদ্যুৎ বিতরণ লাইন নির্মাণ, ৫৫টি নতুন ৩৩/১১ কেভি উপকেন্দ্র স্থাপন, বিদ্যমান ৫৬টি ৩৩/১১ কেভি উপকেন্দ্রের ৫৩৫ এমভিএ ক্ষমতা বাড়ানো, ৬২ সেট রিভার ক্রসিং টাওয়ার নির্মাণ, ১৮ দশমিক ৪০ একর ভূমি অধিগ্রহণ, একটি সুইচিং স্টেশন নির্মাণ এবং ১৬ দশমিক ৯০ লাখ নতুন গ্রাহককে সংযোগের আওতায় আনা।

যেসব কারণে প্রকল্প সংশোধন

প্রকল্পটি সংশোধন ও প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে যাওয়ার পেছনে মূলত চারটি কারণ তুলে ধরা হয়েছে সংশোধনী প্রস্তাবে।

নতুন  লাখ ৬০ হাজার গ্রাহক: ২০১৭ সালে প্রকল্পটি তৈরির আগে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলোর কনসালট্যান্টের মাধ্যমে এক জরিপ চালানো হয়। ওই জরিপের ভিত্তিতে এই প্রকল্পের আওতায় ১৩ লাখ ৩০ হাজার নতুন গ্রাহকের কাছে সংযোগ পৌঁছানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। তবে বর্তমানে প্রকল্প এলাকায় নতুন অনেক বসতবাড়ি গড়ে উঠেছে। এছাড়া নদী ভাঙনের ফলে আশপাশের এলাকায় নতুন বসতিও গড়ে উঠেছে। এসব এলাকাসহ বিভিন্ন চরাঞ্চলের অফগিড এলাকাগুলোয় শতভাগ বিদ্যুতায়নের জন্য অতিরিক্ত আরও ৩ লাখ ৬০ হাজার গ্রাহককে সংযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে সংশোধিত প্রকল্পে। ফলে প্রকল্পের আওতায় মোট ১৬ লাখ ৯০ হাজার গ্রাহককে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হবে।

বিতরণ লাইনের পরিমাণ  উপকেন্দ্রের সংখ্যা বৃদ্ধি: গ্রাহক সংখ্যা বেড়ে যাওযায় সংশোধিত ডিপিপিতে বিতরণ লাইনের পরিমাণ ৩৮ হাজার কিলোমিটার থেকে ১০ হাজার ২৪৫ কিলোমিটার বাড়ানো হয়েছে। অর্থাৎ সংশোধিত প্রকল্প প্রস্তাবনা অনুযায়ী বিদ্যুৎ লাইনের পরিমাণ হবে ৪৮ হাজার ২৫৫ কিলোমিটার। আবার নতুন উপকেন্দ্রের সংখ্যা ৪৮টি থেকে সাতটি বাড়িয়ে করা হচ্ছে ৫৫টি। আর ৫৬টি উপকেন্দ্রের সক্ষমতা ৩৭৫ এমভিএ থেকে ১৬০ এমভিএ বাড়িয়ে ৫৩৫ এমভিএ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

যন্ত্রপাতি  সরঞ্জামে বাড়তি ব্যয়: প্রস্তাবিত সংশোধনীতে অতিরিক্ত ১০ হাজার ২৪৫ কিলোমিটার বিতরণ লাইনের জন্য বৈদ্যুতিক মালামাল বাবদ ব্যয় ৪ হাজার ৬০০ কোটি ১১ লাখ টাকা থেকে ১ হাজার ৪৪১ কোটি ৬০ লাখ টাকা বাড়িয়ে ৬ হাজার ৪১ কোটি ৭২ লাখ টাকা ধরা হয়েছে। অতিরিক্ত সাতটি নতুন উপকেন্দ্র নির্মাণ ও ৫৬টি উপকেন্দ্রের ১৬০ এমভিএ ক্ষমতা বাড়াতে বৈদ্যুতিক মালামাল কেনার জন্য ব্যয় ১৯৭ কোটি ৭৯ লাখ টাকা থেকে ২০ কোটি ৬৫ লাখ ৫৩ হাজার টাকা বাড়িয়ে ধরা হয়েছে ২১৮ কোটি ৪৪ লাখ টাকা।

বৈদ্যুতিক লাইন নির্মাণ কাজে বাড়তি ব্যয়: মূল প্রকল্পে বৈদ্যুতিক লাইন নির্মাণ বাবদ খাতে ৫৮৭ কোটি ৩৪ লাখ টাকা ধরা হয়েছিল। সংশোধিত প্রকল্প প্রস্তাবে অতিরিক্ত ১০ হাজার ২৪৫ কিলোমিটার বিতরণ লাইনের জন্য ১৫৮ কোটি ৩৮ লাখ ৪৫ হাজার টাকা বেশি ধরা হয়েছে। ফলে এই খাতে মোট ব্যয় ৭৪৫ কোটি ৭২ লাখ টাকা। এছাড়া অতিরিক্ত সাতটি বৈদ্যুতিক উপকেন্দ্রের জন্য এ অংশের নির্মাণ ব্যয় ৩৮৪ কোটি টাকা থেকে ৭ কোটি ৪২ লাখ টাকা বাড়িয়ে ধরা হয়েছে ৩৯১ কোটি ৪২ লাখ টাকা।