ভয়াবহ সংকটে হোসিয়ারি শিল্পের দেড় হাজার কোটি টাকার বানিজ্য

704

ছবি : প্রতিবছর ঈদ মওসুমে জমজমাট থাকা নারায়ণগঞ্জ হোসিয়ারি পল্লী করোনা দুর্যোগের কারনে এখন সুনশান নীরবতা

* ৩ হাজার কারখানা বন্ধ,দেড় লাখ শ্রমিক বেকার * ঈদ মওসুম ধরার জন্য আগে তৈরী করা পন্য গোডাউন বোঝাই,ক্রেতা নেই *লকডাউনের কারনে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসতে পারছে না পাইকাররা*এফবিসিসিআইর কাছে ঋন মওকুফের আবেদন

ইউসুফ আল আজিজ : করোনা দুযোর্গের কারনে ভয়াবহ সংকটে পড়েছে নারায়ণগঞ্জের হোসিয়ারি শিল্প। প্রতিবছর পহেলা বৈশাখ এবং ঈদ কেন্দ্রিক জমজমাট থাকা এ শিল্পে এখন করুন দশা। লকডাউনের কারনে নারায়ণগঞ্জে আসতে পারছে না দেশের বিভিন্ন জেলার পাইকাররা।
অন্য দিকে পহেলা বৈশাখ ও ঈদ মওসুমে বিক্রি করার আশায় আগ থেকেই পন্য তৈরী করে গোডাউন বোঝাই করে রেখেছে হোসিয়ারি মালিকরা কিন্ত করোনার কারনে বিক্রি করার মতো কোন ক্রেতা নেই। এছাড়া দোকান ভাড়া,শ্রমিকদের বেতন নিজেদের সংসার সব কিছুর আর্থিক যোগান দিতে গিয়ে চরম সংকটে পড়েছে ব্যবসায়িরা।
ক্ষতিগ্রস্থ ব্যবসায়িরা বলছেন, করোনা দুর্যোগে হোসিয়ারি শিল্পে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার ক্ষতির মূখে পড়েছে। পরিস্থিতি উত্তরন না হলে এশিল্প টিকে থাকা দায় হবে।
বাংলাদেশ হোসিয়ারী সমিতির সভাপতি নাজমুল আলম সজল  জানান, করোনার কারনে মহাসংকটে পড়েছে হোসিয়ারি শিল্প । কারন হোসিয়ারি পন্য দেশের ভেতরে সরবরাহ করা হয়। লকডাউনের কারনে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পাইকাররা আসতে পারে না। অন্যদিকে মালমাল তৈরী করে গোডাউন স্তুপ করে রেখেছে ব্যবসায়িরা। কিন্ত বিক্রি তো নাই।
তিনি জানান, হোসিয়ারি ব্যবসায়া মুলত সিজন কেন্দ্রিক। বিশেষ করে পহেলা বৈশাখ এবং দুই ঈদে বেচা কেনা করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়িরা কোন মতে টিকে থাকে। এবার করোনা কারনে পহেলা বৈশাখের ব্যবসা ধস নেমেছে। লকড্উানের কারনে পাইকাররা আসাতে পারেনি। ফলে বকেয়া টাকা পায়নি মালিকরা। অন্যদিকে সামনে ঈদের ব্যবসাও নেই। ফলে এশিল্পের সাথে জড়িতরা মহাসংকটে আছে। পাশাপাশি লোকসানে মুখে এশিল্পের প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার বানিজ্য।
তিনি জানান, হোসিয়ারী শ্রমিকরা কর্মহীন হয়ে ঘরে বন্দি। ঘরে ঘরে চাপা হাহাকার। সরকারের প্রণোদনা না পেলে এই শিল্পের বিরাট ক্ষতি হয়ে যাবে। দেউলিয়া যাবে ৩ হাজার হোসিয়ারী মালিক। সম্পূর্ণ বেকার হয়ে যাবে দেড়লাখ শ্রমিক। আমরা এই শিল্পকে বাঁচাতে এফবিসিসিআই মারফত হোসিয়ারী শিল্প মালিকদের ঋণ মওকুফ এবং নুতনভাবে স্বল্প সুদে ও সহজ শর্তে ঋণ প্রদানের জন্য সরকারের নিকট সুপারিশ জানিয়েছি।
নারায়ণগঞ্জ শহরের একজন হোসিয়ার ব্যবসায়ি নূর আলম। শহরের দেওভোগ পাক্কা রোডের বাসিন্দা। তাঁর হোসিয়ারী কারখানাটি বাসাতেই। বাসায় কারখানাতে মাল তৈরী করে মার্কেটে পাইকারী সাপ্লাই দেয়। নূর আলম শিশুদের গেঞ্জি ও প্যান্ট তৈরী করে। তিন জন কারিগর নিয়ে নিজে কারখানা চালান। দু’জন কারিগর লকডাউনের সময় বেতন নিয়ে গ্রামে চলে গেছে। একজন কারিগরকে তিনবেলা খাওয়াতে হয়। তার বেতন দেয়া হয়নি দুই মাস ধরে। ঈদের সময় সে গ্রামের বাড়ি যাবে। কিছু টাকা পয়সাতো দিতেই হবে।
তাছাড়া নূর আলমের নিজেরও বাসা ভাড়া জমে গেছে। ৬ জনের সংসার। নূর আলমের কন্ঠে হাহাকার। তিনি জাানান,আমার সব সবশেষ। মাল (হোসিয়ারি পন্য) বানাইয়া ঘরে স্টক করছি। এক পিসও বিক্রি নেই। আগে তিনজন কারিগর আছিলো। এখন একজন। এই একজনেরও বেতন দিতে পারতাছিন না। কেমনে সংসার চলবো। সমিতি থেকে কিস্তিতে টাকা নিয়া মাল বানাইছি। ঘরে দেড় টাকার মাল। বেচতে না পারলে মইরা যামুগা। ‘
বাংলাদেশ হোসিয়ারি এসোসিয়শনের সচিব সবদার হোসেন  জানান,হোসিয়ারি ব্যবসায়িরা চরম সংকটে পড়েছে। এরকম সংকটে আর কখোনো পড়েনি ব্যবসায়িরা। করোনা কারনে পহেলা বৈশাখের সিজনটা মিস হয়েছে। সামনে ঈদ সে সিজনটা ও ধরতে পারবে না। মালমাল তৈরী করে গোডউন বোঝাই কিন্ত ক্রেতা নেই। লকডাডনের কারনে ক্রেতা আসতে পারছেন। ফলে মহাসংকেট হোসিয়ারি ব্যবসা। এভাবে চলতে থাকলে অনেকে দেউলিয়া হয়ে যাবে। ইতোমধ্যে ব্যবসায়িদের হাহকার শুরু হযেছে। করোনা দুর্যোগের কারনে হোসিয়ারী শিল্পের প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা ক্ষতির মুখে।
খোজ নিয়ে জানা যায়,নারায়ণগঞ্জে চলছে লকডাউন।ঈদকে ঘিরে মার্কেটগুলো জমজমাট থাকে, এবার নেই। রেডিমেড পোষাকের একটি বিশাল অংশ তৈরী করে নয়ামাটিসহ অন্যান্য এলাকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা, ফ্যাক্টরী বন্ধ উৎপাদন নেই, চাহিদাও নেই। পাইকার আসছেনা। হোসিয়ারি পল্লীতে যেন সুনশান নীরবতা। নারায়ণগঞ্জে ৩ হাজার হোসিয়ারী কারখানা বন্ধ আছে। বেকার হয়ে পড়েছে দেড় লাখ হোসিয়ারী শ্রমিক।
স্টকের মাল (হোসিয়ারি পন্য ) বিক্রি করা না গেলে অনেক ব্যবসায়ী দেউলিয়া হয়ে যাবে। বড় বড় ব্যবসায়ীরা ব্যাংক ঋণ নিয়ে সারাবছর মাল তৈরী করেছে রমজানের সিজনের আশায়। এখনো মার্কেট বন্ধ। এভাবে চলতে থাকলে দেউলিয়া হয়ে যাবে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। মাঝারি ব্যবসায়ীর পুঁজি ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা। ছোট ব্যবসায়ীরা ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা। ২ লাখ টাকা নিয়েও ব্যবসা করছে অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী।
ঋণ মওকুফের জন্য এফবিসিসিআইএর কাছে লেখা বাংলাদেশ হোসিয়ারী এসোসিয়েশনের চিঠিতে উল্লেখ করেন হোসিয়ারী শিল্প দেশের বস্ত্র খাতের উপ-খাত হিসেবে চিহ্নিত। হোসিয়ারী শিল্প ও শিল্প অধ্যুষিত ও ব্যবসা সমৃদ্ধ নারায়ণগঞ্জ জেলায় ১৯৫০ দশকে হোসিয়ারী শিল্পের অগ্রযাত্রা শুরু হয়।
ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, ডেমরা, কুমিল্লা, পাবনা, গাজীপুর সহ বিভিন্ন জেলায় অবস্থিত প্রায় ৩ হাজার হোসিয়ারী শিল্প ইউনিট এসোসিয়েশনের সদস্য। এ শিল্পে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে ১ লক্ষ শ্রমিক কাজ করে যাচ্ছে। বৎসরে প্রায় ১৫-১৬ শত কোটি টাকা স্থানীয়ভাবে হোসিয়ারী উৎপাদিত পণ্যের টার্নওভার অর্জিত হয় এবং অন্যদিকে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হোসিয়ারী পণ্য দেশের সর্বস্তরের জনগনের চাহিদা মেটাতে সক্ষম হয় ।
হোসিয়ারী শিল্পে মৌসুম ভিত্তিক চাহিদার প্রেক্ষাপটে গ্রীষ্মকালে গেঞ্জি, আন্ডার ওয়্যার এবং শীতকালে সুয়েটার, কার্ডিগান, মাফলার, টুপি, বেবীসেট সহ নানাবিধ যুগোপযোগী হোসিয়ারী পণ্য উৎপাদন করা হয়। হোসিয়ারী শিল্প আমদানি নির্ভরশীল শিল্প।
হোসিয়ারী পণ্য উৎপাদনে কাঁচামাল হিসেবে সূই, সিংকার যাবতীয় মেশিন, সূতা, ডাইস ক্যামিকেল, জিপার, ইলাষ্ট্রিক, বোতাম, কাড বোর্ড, হাড বোর্ড, পলি, টিকিট ইত্যাদি উপকরন আমদানি করতে হয়।
গত বৎসরের শেষ দিকে শুরু হওয়া করোনা ভাইরাসের প্রভাবে বাংলাদেশের আমদানি বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। সম্প্রতি করোনা ভাইরাসের কারণে সকল হোসিয়ারী প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় হোসিয়ারী মালিকগণ চরম আর্থিক সংকটের সম্মুখীন হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে এবং আর্থিক দৈনদশায় পতিত হয়েছেন। এ অবস্থা বিরাজমান থাকলে হোসিয়ারী মালিকগন ব্যবসার মূলধন হারিয়ে নিঃসন্দেহে চরম আর্থিক সংকটে পতিত হবেন ।
সম্প্রতি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদশ সরকার ক্ষতিগ্রস্থ বিভিন্ন খাতকে সচল ও গতিশীল করার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে করোনা ভাইরাসের কারণে অর্থনৈতিক প্রভাব মোকাবেলায় দেশের অর্থনৈতিক কর্মকান্ড সচল রাখা, শ্রমিক কর্মচারীদের কাজে বহাল এবং উদ্দ্যোক্তাদের প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা অক্ষুন্ন রাখার লক্ষ্যে স্বল্প সুদে ঋণ সুবিধা প্রবর্তনের লক্ষ্যে বিগত ৫ এপ্রিল ২০২০ ইং তারিখে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ক্ষতিগ্রস্থ শিল্প সেক্টরের প্রতিষ্ঠান সমুহের জন্য ওয়ার্কিং ক্যাপিট্যাল হিসাবে ঋণ/বিনিয়োগ সুবিধা প্রদানের লক্ষ্যে ৩০ হাজার কোটি টাকার আর্থিক সহায়তা ঘোষনা করেন।
চিঠিতে আরো বলা হয়, হোসিয়ারী শিল্পকে অন্যান্য বৃহদায়তন শিল্পের ন্যায় গন্য করা কোনক্রমেই সমীচীন নয়। কারণ হোসিয়ারী শিল্পে পুঁজি বিনিয়োগ, মূলধন, শ্রমিক সংখ্যা এবং শিল্প প্রতিষ্ঠানের জায়গার পরিমাণ বৃহদায়তন শিল্পের মত নয়।
ঐতিহ্যবাহী হোসিয়ারী শিল্পের অস্তিত্ব রক্ষা এবং গতিশীল উৎপাদন অব্যাহত রাখার লক্ষ্যে ইতিপূর্বে যে সকল প্রতিষ্ঠান ঋণ গ্রহন করেছেন তাদের ঋণ সম্পূর্নভাবে মওকুফ করা এবং নূতনভাবে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ও স্বল্প পুঁজি সম্পন্ন হোসিয়ারী মালিকদেরকে সহজ শর্তে ঋণ প্রদানের সহায়তা চেয়ে এসোসিয়েশনের পক্ষ হতে জোর সুপারিশ করা হল।