রিটায়ার্ড করার পর বীমাতে একটা চাকরি চাই : প্রধানমন্ত্রী

695

মিরর বাংলাদেশ: একসময় পোশাক কারখানাগুলোতে ঘন ঘন আগুন লাগার ঘটনায় ইনস্যুরেন্সের টাকার যোগসূত্রের দিকে ইঙ্গিত করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, আমি যেটা বলি, খুব সত্য বলি। একটা সময় পোশাক কারখানাগুলোতে ঘন ঘন আগুন লাগত। এত আগুন কেন লাগত? ইনস্যুরেন্সের টাকা খাওয়ার জন্য আগুন লাগে না তো? আমি গোয়েন্দা সংস্থা দিয়ে তদন্ত করালাম যে সত্যিই আগুন লাগছে কি না। কিছু কিছু ধরাও পড়ল। আর কিছু কিছু লোককেই নিজেই বলে ফেললাম, ভাই আর কত খাবেন, অনেকবার তো নিলেন! আমি যেহেতু চিনি, আমার একটু বলার অধিকার আছে, সেজন্যই বললাম।
রোববার রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে জাতীয় বিমা দিবসের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআর) নির্দেশনাবলী ও ‘বীমা ম্যানুয়াল’ নামক দুইটি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করেন প্রধানমন্ত্রী। অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিমা খাতে অবদানের জন্য মরহুম গোলাম মাওলা, মরহুম খোদা বক্স, মরহুম এস এ চৌধুরী, মরহুম এম এ সামাদ, এম শামসুল আলমকে পুরস্কৃত করা হয়। পরে আইডিআরের পক্ষ থেকে ক্রেস্ট দেওয়া হয় শেখ হাসিনা।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনারা খেয়াল করেছেন কি নাÍ স্বাধীনতার পরপর পাটের গুদামে-কারখানায় আগুন লাগত। তারা ইনস্যুরেন্স কোম্পানির টাকা পেত। দেখা যেত, পাট বিক্রি দিয়ে আগুন লাগিয়ে ইনস্যুরেন্স কোম্পানিতে মোটা অঙ্কের ডিমান্ড দিয়ে মোটা টাকা হাতিয়ে নিত। ঠিক একই ধরনের ঘটনা বাংলাদেশেও পোশাক কারখানাগুলোর ক্ষেত্রে ঘটেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বিমা খাতের সংশ্লিষ্টদের উদ্দেশে শেখ হাসিনা বলেন, কোনো কারখানায় আগুন লাগলে আপনারা যাদের পরিদর্শনে পাঠিয়ে থাকেন, তাদের ভালো প্রশিক্ষণ থাকতে হবে, সৎ মানুষ হতে হবে। গ্রাহক যেন ইনস্যুরেন্সের প্রিমিয়ামটা ঠিকমতো দেন সেটা নিশ্চিত করতে হবে, আবার বিমার টাকাটা যেন সঠিকভাবে পান, সেটাও দেখতে হবে। যতটুকু ক্ষতি, ততটুকুই বিমা পাবে। ফাঁকি দিয়ে অতিরিক্ত টাকা নেওয়াÍ এই প্রবণতাটা দূর করতে হবে।
বিমা খাতে অ্যাকচুয়ারি সংকটের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের এখানে আরেকটা সমস্যা আমরা দেখি অ্যাকচুয়ারি পাওয়া যায় না। আমরা সরকার গঠন করার পর লন্ডন থেকে একজনকে নিয়ে আসলাম। কিন্তু তিনি দু’বারের বেশি থাকতে পারেন না। কিন্তু অ্যাকচুয়ারি দরকার সার্বক্ষণিক। এ বিষয়ে যারাই পড়ালেখা করে, বিশেষ করে ব্রিটেনে পড়ালেখা করলে এত বড় চাকরি পেয়ে যায় যে দেশে আসতে চায় না। এ ক্ষেত্রে আমি মনে করি, দক্ষ জনশক্তির গড়ার জন্য জাতির পিতা একাডেমি তৈরি করে দিয়ে গেছেন। কিন্তু আমরা কেন এটা করতে পারছি না? প্রয়োজনে শর্ত দিয়ে নিজেদের অর্থ খরচ করে পড়ালেখা করিয়ে পেশাদার অ্যাকচুয়ারির সংখ্যা বাড়ানোর পরামর্শ দেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের দেশে বিমা সম্পর্কে সচেতনতা খুবই কম। আর এই বিমা মানুষকে সেবা দিতে পারে, এর মাধ্যমে বহু মানুষের কর্মসংস্থানও হতে পারে। একটা সময় বিমা কোম্পানিগুলো উপার্জনের ভালো পথ ছিল। এখন সেটা একটু কম। আমি মনে করে, এটা আবার ফিরে আসা উচিত। এই খাতে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা উচিত।
অবসর নেওয়ার পর বিমা কোম্পানিতে চাকরি করার ইচ্ছা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জাতীয় বিমা দিবস উদ্বোধন করতে এসে জানালেন, ‘আমার জন্যও যেন একটা চাকরি থাকে, রিটায়ার্ড করার পর একটা চাকরি চাই।’
১৯৬০ সালের ১ মার্চ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তৎকালীন আলফা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিতে যোগ দিয়েছিলেন। দিনটিকে স্মরণ করে মন্ত্রিপরিষদ সভায় সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে ১ মার্চ জাতীয় বিমা দিবস ঘোষণা করা হয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতা বিমা কোম্পানিতে চাকরি করতেন। আমার জন্যও যেন একটা চাকরি থাকে।’এ সময় মঞ্চে বসে থাকা একজনের প্রশ্নের প্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী হাসতে হাসতে বলেন, ‘না রিটায়ার্ড করার পর একটা চাকরি চাই।’
তার আগে প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুর ইন্সুরেন্স কোম্পানিতে চাকরির প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলেন, ১৯৬০ সালের ১ মার্চ আলফা ইন্সুরেন্স কোম্পানিতে তিনি একটা পদে যোগ দেন। কন্ট্রোল অফ এজেন্সি হিসাবে তিনি যোগ দিয়েছিলেন। এখনকার বঙ্গবন্ধু এভিনিউ ছিল তখনকার জিন্নাহ এভিনিউ, ওখানে তিনি অফিস পান। ওই সময় তাজউদ্দিন ফতুল্লায় একটা চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন। আমাদের একটা লাল জীপ গাড়ি ছিল। অফিস পাওয়ার পরই বঙ্গববন্ধু সেই জীপে করে ফতুল্লা চলে যান এবং তাজউদ্দিন সাহেবকে তুলে নিয়ে আসেন। বলেন, তোমার চাকরি করা লাগবে না, তুমি আমার সাথে ইন্সুরেন্স কোম্পানিতে চাকরি করবে। সেই সঙ্গে ঢাকার প্রয়াত মেয়র মোহাম্মদ হানিফকেও চাকরি দিয়েছিলেন, নিজের পিএ হিসেবে।
ইন্সুরেন্স কোম্পানির অফিসার হিসাবে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন শাখা অফিসে যাওয়ার উপলক্ষ্যে গোপনে গোপনে রাজনৈতিক কর্মকান্ডে সক্রিয়তা বজায় রেখেছিলেন। যেহেতু রাজনীতি নিষিদ্ধ কিন্তু ইন্সুরেন্স কোম্পানির একজন অফিসার হিসেবে তার দায়িত্ব ছিল ইন্সুরেন্স কোম্পানিকে ব্যাপকভাবে প্রচার ও প্রসার ঘটানো। সেই সূত্র ধরে তিনি সারাদেশ সফর করতেন। এতে একসঙ্গে দুটি কাজই হত। যোগ করেন প্রধানমন্ত্রী।
১৯৬৫ সালে পাকিস্তান ভারত যুদ্ধ হওয়ার পর আমাদের এই ভূখন্ড ছিল অরক্ষিত। তিনি ছয় দফা দাবি তুলে ধরেছিলেন। সেই দাবি পাকিস্তান মেনে নেয়নি। এর বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধু যখন আন্দোলন শুরু করেন, তখন তাকে গ্রেফতার করা হয়। ৮ই মে ১৯৬৬ সালে তাকে গ্রেফতার করা হয় এবং ওই অবস্থায় তার বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা দেওয়া হয়। রাষ্ট্রদ্রোহী মামলা অর্থ্যাৎ রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিব। যে মামলাটা আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা হিসেবে পরিচিত ছিল। জানান প্রধানমন্ত্রী।
শেখ হাসিনা বলেন, ঢাকা ক্যান্টনমেনেটর ভেতরে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিচার কার্যক্রম শুরু হলে সারাদেশে তার মুক্তির দাবিতে তীব্র আন্দোলন শুরু হয় তার বিভিন্ন দিক তুল ধরে বলেন, ওই আন্দোলনের মুখে আইয়ুব খান বাধ্য হয়েছিল মামলা প্রত্যাহার করতে। ২১ ফেব্রæয়ারি সে মামলা প্রত্যাহার করে ২২ ফেব্রæয়ারি তাকে মুক্তি দেওয়া হয়। মুক্তির পরপরই আবার আরেকটি ইন্সুরেন্স কোম্পানি থেকেই তার কাছে একটি প্রস্তাব যায়। তখন তিনি সেখানে উপদেষ্টা হিসাবে যোগ দেন