সংকটে অসহায় শিল্প মালিকরা

70

*  ডলার সংকটে মালামাল সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে
*  ডলারের লিমিট ৩০ পার্সেন্ট কমিয়ে দিয়েছে ব্যাংক
* বেশি দাম পরিশোধের পরও গ্যাস সংকটে কারখানার কমে গেছে উৎপাদন
*  বন্ধ হচ্ছে কারখানা,বেকার হওয়ার আশংকায় লাখ লাখ শ্রমিক

  • মিরর বাংলাদেশ  :
    বহুমুখী সংকটে অসহায় হয়ে পড়েছে দেশের তৈরী পোষাক শিল্প মালিকরা। গ্যাসের মূল্য বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু গ্যাস না পাওয়ার কারণে বন্ধ হয়ে গেছে অনেক শিল্পকারখানা। বিদেশি ক্রেতাদের সময়মতো পণ্য দিতে পারছেন না অনেক রপ্তানিকারক। এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে সামনের দিনগুলোতে বাংলাদেশের পোশাক খাতের অর্ডার অন্য দেশে চলে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন গার্মেন্টস শিল্প উদ্যোক্তারা ।
    দেশের গার্মেন্টস শিল্পের বেশীর ভাগ কারখানা নারায়নগঞ্জ জেলায়। এখানের গার্মেন্টস মালিকরা জানান, নানা রকম সংকটে পড়েছেন তারা। বিশেষ করে এসব সংকটের প্রভাব পড়বে শ্রমিকদের উপর। নিরবিচ্ছিন্ন গ্যাস না পাওয়া গেলে নতুন শিল্প উদ্যোক্তারা যেমন মুখ ফিরিয়ে নেবে তেমনি শিল্প কারখানা বন্ধ হলে লাখ লাখ শ্রমিক চাকরি হারাবে।
    তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের বৃহৎ সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি একেএম সেলিম ওসমান জানান, আমরা এখন অসহায়। নিরীহ মানুষের থেকেও আমরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। আমরা যারা গার্মেন্টে ব্যবসার কারনে ডলার নিয়ে ব্যবসা করি আমাদের মতো অসহায় অবস্থা অন্য কোন ব্যবসায় দেখা যায় নাই।
    সেলিম ওসমান বলেন, ব্যাংক আমাদের ডলারের লিমিট দিয়েছে। হঠাৎ সকালে শুনলাম ডলারের লিমিট ৩০ পার্সেন্ট কমিয়ে দিয়েছে। এটা কেমন কথা। আমরা এলসি খুলছি আমাদের যারা সাপ্লাই করছে তাদেরকে ডলার দেয়া যাচ্ছে না। কারণ ব্যাংকের কাছে ডলার রিজার্ভ নাই। আমাদেরকে মালামাল সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে। কয়েকদিন সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। ডলারের অভাব।
    তিনি বলেন, গ্যাস আমাদের শেষ হয়ে গেছে। সরকার আমাদেরকে বললেন তোমরা যদি ইমপোর্টের পয়সা দাও আমরা তোমাদেরকে গ্যাস দিবো। আমরা দীর্ঘ মিটিং করলাম। রাজি হয়ে গেলাম গ্যাসের দাম বৃদ্ধি করে দেন। ১০০ পার্সেন্ট বৃদ্ধি করে দেয়া হলো। আমাদের মানুষগুলোকে বাঁচতে হবে। আমরা বাঁচবো কিনা সেটা কথা ছিল না শ্রমিক ভাইয়ের বাঁচার কথা চিন্তা করি। ৬৫ পার্সেন্ট মহিলা শ্রমিক আমাদের কাজের উপর নির্ভর করছে।
    কোনো লাভের মুখ দেখেন না উল্লেখ করে সেলিম ওসমান বলেন, অনেকে মনে করেন আমরা যারা ব্যবসা করি আমরা যারা এক্সপোর্ট করি আমরা খুব ভালো আছি। বিশ্বাস করেন আমাদের মতো অবস্থা কারও নেই। আমরা অসহায় এখন। আমরা লাভের মুখ দেখি না। আমরা লস করতে করতে এমন জায়গায় এসে ঠেকেছি আমার কাছে মনে হয় আমার দাদা যে ব্যবসা (পাটের ব্যবসা) করতো আমরা সে ব্যবসা করছি।
    খোজ নিয়ে জানা গেছে, ভয়াবহ গ্যাস সংকটে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার, রূপগঞ্জ, সোনারগাঁ, ফতুল্লার কাঠেরপোল, বিসিক শিল্পনগরীসহ জেলার বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে। গ্যাস সংকটের কারণে রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাকশিল্পের উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে।
    শিল্পাঞ্চলগুলোতে সরেজমিনে ঘুরে জানা যায়, গত কয়েক মাস ধরে নারায়ণগঞ্জের ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের দুই পাশে আড়াইহাজার সাওঘাট, রূপগঞ্জ, সোনারগাঁ, ফতুল্লার কাঠেরপোল, বিসিক শিল্পনগরী ও জেলার শিল্প কারখানায় ভয়াবহ গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে।
    গত চার মাসে গ্যাস সংকটের কারণে বন্ধ হয়ে গেছে ৪০টির অধিক শিল্প কারখানা। যারা কারখানা চালু রাখছেন, তাদেরও চালাতে হচ্ছে ধুঁকে ধুঁকে। কাপড় ডাইং করতে গেলে গ্যাস মিলছে না। যেখানে ১০ পিএসআই গ্যাসের প্রেসার থাকার কথা, সেখানে নেমে এসেছে শূন্যের কোঠায়। গ্যাস সংকটে উৎপাদন বন্ধ থাকায় অলস সময় পার করছেন শ্রমিকরা।
    ফতুল্লার কাঠেরপোল এলাকায় অবস্থিত আজাদ রিফাত ফাইবার্স প্রাইভেট লিমিটেডের পরিচালক মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম রাজীব জানান, গ্যাস সংকটের এমন দুরবস্থায় গ্যাস বিল দেওয়া হচ্ছে কিন্তু গ্যাস লাইনে পাওয়া যাচ্ছে বাতাস। গ্যাস সংকটে সময় মতো বিদেশি ক্রেতাদের অর্ডারকৃত পণ্য না দিতে পারায় অনেক অর্ডার বন্ধের পথে। আবার গ্যাসের বিলও অনেক বাড়ানো হয়েছে।
    ফতুল্লা পঞ্চবটির বিসিক শিল্পনগরীর ক্রোনি গ্রæপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এএইচ এম আসলাম সানী জানান, আড়াই বছর ধরে গ্যাস সংকটে ভুগছি। ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধের পরে অর্থনৈতিক যে মন্দা, সেই মন্দায় প্রত্যেকটি বায়ার ৩০ শতাংশ আরএমজি কম দিচ্ছে, ডিমান্ড কমে গেছে মার্কেটে। ডিমান্ড কমে যাওয়ায় আমরা কিছু কিছু অর্ডার পাচ্ছি। আবার টিকে থাকার জন্য অর্ডারগুলো এক্সিকিউট করতে পারছি না, গ্যাস সংকটের কারণে। গ্যাসের মূল্য বাড়ানোর পর ব্যবসায়ীদের নিরবিচ্ছিন্ন গ্যাস দেওয়া হবে বলে সরকার জানিয়েছিল, কিন্তু সেটা বিভিন্ন কারণে ব্যাহত হচ্ছে।
    নারায়ণগঞ্জের ফেয়ার অ্যাপারেলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ কাশেম জানান, আমরা বিদেশি ক্রেতাদের কাছ থেকে অর্ডার নিয়েছি কিন্তু গ্যাস সংকটের কারণে ডায়িং করতে পারছি না। গ্যাসের প্রেসার নেই। যখন থাকে তখন এত কম থাকে আমরা জেনারেটর চালাতে পারি না। একদিনের মধ্যে অর্ধেকের বেশি সময়ই জেনারেটর বন্ধ রাখতে হচ্ছে গ্যাস না থাকার কারণে। বয়লার বন্ধ। কাপড় ডাইং মেশিনে উঠানো হলেও কন্টিনিউ প্রসেস না হলে গ্যাস ফল্ট করলে তখন ফেব্রিক্স এর সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। আবার দ্বিতীয়বার ডাইং করতে দুই গুণ সময় লাগে। তাতে বেড়ে যায় উৎপাদন খরচ। কিন্তু বিদেশি ক্রেতারা এটা বোঝে না। বিদেশি ক্রেতারা বলেন, গ্যাস সংকট এটা তোমাদের সমস্যা, আমাদের তাতে কী। তোমরা অর্ডার নিয়েছ সময় মতো অর্ডার শিপমেন্ট করবা।
    বিজিএমইএ একটি সূত্র জানান, বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির অর্ডার সারা বিশ্বে কমে গেছে। সময় মতো শিপমেন্ট করতে না পারলে বিদেশি ক্রেতারা অর্ডার ক্যানসেল করে দেয়। গত ফেব্রæয়ারির ১ তারিখ থেকে গ্যাসের মূল্য অনেক বাড়ানো হয়েছে। সারা বিশ্বে তেল ও গ্যাসের মূল্য কমে আসছে। তারপরেও সরকার দাম সমন্বয় করার জন্য দাম বাড়িয়েছে। আমাদেরকে বলা হয়েছিল নিরবিচ্ছিন্ন গ্যাস সাপ্লাই দেবে। কিন্তু দুঃখের বিষয় আমরা নিরবিচ্ছিন্ন গ্যাস পাচ্ছি না। গ্যাস সংকটের কারণে ফ্যাক্টরিগুলোর প্রোডাকশন অনেক কমে গেছে। একদিকে অর্ডার কম অন্যদিকে উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে। এর মধ্যে বিদ্যুতের দামও বাড়ানো হয়েছে। শ্রমিকদের বেতন বাড়ছে, আগামীতে আরও বাড়বে। এই ক্ষেত্রে আমরা যদি গ্যাস না পাই তাহলে আমরা বায়ারদের সময়মতো পণ্য রপ্তানি করতে পারছি না। ইতোমধ্যে এই মাসের এপ্রিল থেকে গত বছরের এপ্রিল থেকে ১৬ শতাংশ অর্ডার কমে গেছে। মে মাসে অর্ডার আরও কমে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। আমাদের ফরেন কারেন্সির রিজার্ভ যেখানে ২০২১ এর আগস্ট মাসে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের উপরে ছিল, সেটা নেমে ৩০ বিলিয়ন ডলারে চলে এসেছে। সুতরাং এক্সপোর্ট যদি আমরা ধরে রাখতে না পারি তাহলে ফরেন কারেন্সির ওপরে আরও চাপ পড়বে।
    বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশেনের (বিটিএমএ) পরিচালক ও ফতুল্লার হাশেম স্পিনিং মিলের এমডি এম সোলায়মান বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে দেশের অধিকাংশ স্পিনিং মিলের উৎপাদন ৩০ ভাগ কমে গিয়েছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে অনেক স্পিনিং মিল বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
    তিতাস গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন অ্যান্ড ট্রান্সমিউশন কোম্পানি লিমিটেড নারায়ণগঞ্জ আঞ্চলিক কার্যালয় বলছে নারায়ণগঞ্জে গ্যাসের চাহিদা রয়েছে ১২০ মিলিয়ন ঘনফুট। সেখানে আমরা পাচ্ছি ৭০ থেকে ৮০ মিলিয়ন ঘনফুট। চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ না থাকায় গ্যাসের সংকট রয়েছে । #