স্বীকৃতির লড়াইয়ে হেরে যাচ্ছেন মুক্তিযোদ্ধা নজরুল মল্লিক

953

ছবি : মুক্তিযোদ্ধা নজরুল ইসলাম মল্লিক

কামাল উদ্দিন সুমন : বয়োবৃদ্ধ লোকটার নাম নজরুল ইসলাম মল্লিক। বয়স পৌছে গেছে ৬৮ বছরের কোটায়। চাকরি করতেন পুলিশ বিভাগে। কনষ্টেবল পদে চাকরির মেয়াদ শেষে এখন অবসরে । মহান মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশ গ্রহনের কারনে বীরত্বের স্বীকৃতি স্বরুপ ১৯৭২ সালে তার চাকরি হয় পুলিশ বিভাগে। অবসরপ্রাপ্ত এ পুলিশ সদস্য এখন দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতির জন্য। তিনি পান নি মুক্তিযোদ্ধা সনদ। তার নামও তালিকাভুক্ত হয়নি গেজেটে। জীবন সায়াহ্নে এসে নজরুল মল্লিক এখন বড় অসহায়। এক সময় যারা হাতিয়ারের গর্জনে শত্রæরা থাকতো তটস্থ। তার দুচোখে এখন ভেসে বেড়ায় পানি।
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা দেলপাড়া টাওয়ারপাড় এলাকায় নিকট আত্মীয়ের বাসায় বসে এ প্রতিবেদকের সাথে কথা হয় নজরুল ইসলাম মল্লিকের। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহনের অনেকে ঘটনার বর্ণানা দেন তিনি। এক সময় তিনি কেঁদে উঠেন বর্তমানে তার অসহায়ত্বের কথা বলে। তার অভিযোগ, দাবী করা টাকা না দেয়ায় মুক্তিযোদ্ধা গেজেটে তার নাম উঠেনি। এনিয়ে বহু পথ পেরিয়েছেন তিনি। কাজের কাজ কিছু হয়নি। তার সাথের সহযোদ্ধারা আফসোস করছেন মুক্তিযোদ্ধা গেজেটে নজরুল মল্লিকের নাম তালিকাবদ্ধ না হওয়ায় । এনিয়ে তারাও ক্ষুদ্ধ।
জানা যায়,বাগেরহাট জেলার বিষ্ণুপুর কোড়ামারা গ্রামের বারিক মল্লিকের পুত্র নজরুল ইসলাম মল্লিক ১৯৭১ সালের ১৮ বছরের টগবেগে যুবক। তখন স্থানীয় চিরুলিয়া মাধ্যামিক বিদ্যালয়ের ৯ম শ্রেনীর ছাত্র তিনি। সে দিন তিনি জীবনের মায়া ত্যাগ করে শুধু মাত্র দেশের ভালোবাসা তাগিদে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তিনি ছিলেন সম্মুখ যোদ্ধা।
নজরুল মল্লিক জানান, পায়ে হেঁটে সেদিনে ভারত গিয়ে প্রশিক্ষন শেষে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করি। ৯ নং সেক্টর কমান্ডার অবসর প্রাপ্ত মরহুম এম এ জলিল এবং তাইজুল ইসলামের নেতৃত্বে নাজিরপুর ,গজালিয়া ,কার্তিকদিয়া,রঘুনাথপুর,যাত্রাপুর,পানিঘাট,বাবুরহাট, হালিশহরসহ দক্ষিনাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে সরাসরি অংশগ্রহন করি।
তিনি জানান, মুক্তিযুদ্ধ শেষে আমার ব্যবহৃত হাতিয়ার নাইকো মেশিনগান এল এম জি বাগেরহাট পিসি কলেজ ক্যাম্পাসে মুক্তিযুদ্ধের হাতিয়ার জমা দেই। সেময় খুলনা জেলা পুলিশ সুপারের কাছে ১২ কে এল এমজির ম্যাগজিনের ৬০ রাউন্ড গুলিও জমা দেই। হাতিয়ার জমা নেয়া সরকারি রেজিষ্ট্রারে সব রেকর্ড আছে। যুদ্ধে আমার বীরত্ব দেখে আমাকে পুলিশ বিভাগে নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। বাগেরহাট ম্যালিশিয়া ক্যাম্পে আমাকে নিয়ে যাওয়া হয়। ১৯৭২সালের ৪মার্চ আমাকে ম্যালিশিয়া ক্যাম্প থেকে বাগেরহাট নুরুল আমিন হাইস্কুল মাঠে নেয়া হয়। সেখানে ৩শ মুক্তিযোদ্ধা থেকে বাছাই করে আমাকেসহ মোট ৩৯জনকে পুলিশে চাকরি দেয়া হয়। তখন মুক্তিযোদ্ধা সনদ ঢাকা থেকে না যাওয়ার কারনে আমাদের মাঝ বিতরণ হয়নি।
নজরুল মল্লিক জানান,পরবর্তীতে খোঁজ নিয়ে জানতে পারি আমাদের ম্যালিশা ইউনিটের কোন সনদ পাওয়া যাচ্ছেনা। পুলিশের চাকরি করার কারনে আমাকে অনেক স্থানে বদলি হতে হয়েছে। যারা কারনে পরবর্তীতে যখন তালিকা করা হয় আমি গ্রেজেটভুক্ত হওয়ার হওয়ার খবর আমি পাইনি। কারন আমি যুদ্ধ করেছি দেশের জন্য । আমার বিশ্বাস ছিল মুক্তিযোদ্ধা সনদের জন্য আমাকে কোন জটিলতা পড়তে হবে না।
তিনি জানান, জীবনের এই বয়সে এসে আমার ধারনা সব ভুল । এখন আমাকে মুক্তিযুদ্ধের সনদের জন্য লড়াই করতে হচ্ছে। আমার সহযোদ্ধারা এনিয়ে আক্ষেপ করেন। বাগেরহাট থেকে ঢাকায় আসি আর যাই, ভাবতে পারিনি এমন সমস্যা জীবনের শেষ বয়সে এসে পড়তে হবে। আমাকে তালিকাভুক্ত করা নিয়ে টাকা দাবী করা হয়েছিল। আমি রাজি হইনি। বলেছি, দেশের জন্য যুদ্ধ করছি। প্রয়োজনে মুক্তিযোদ্ধা সনদের জন্য শেষ নি:শ্বাস পর্যন্ত লড়াই করবো। কারন আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি নিয়ে মরতে চাই। যে মাটির জন্য লড়াই করছি সে মাটিতে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে শায়িত হতে চাই।