হাফেজ মোক্তারের মৃত্যু,একজন ক্রাইম রিপোর্টারের জবানবন্দি

635

মিরর বাংলাদেশ :  নারায়ণগঞ্জ সদর  উপজেলার সাবেক  চেয়ারম্যান আলীগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা  হাফেজ মোক্তার হোসাইনের মৃত্যু নিয়ে একটি অভিজ্ঞতার জবানবন্দি দিয়েছেন সিনিয়র ক্রাইম রিপোর্টার, বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স এসোসিয়েশনের (ক্র্যাব)   সাবেক সভাপতি    এস এম  আবুল হোসেন। ২৯ বছর আগের সেই মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে সে সময়ের অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে তার ফেসবুকে  ৫ জুন একটা স্ট্যাটাস দিয়েছেন বাংলার বাণী পত্রিকার তখনকার তুখোর এ সাংবাদিক। ১৯৯১ সালের ২৯ নভেম্বর ঢাকার   ফার্মগেটের হলি ক্রস রোডে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান হাফেজ মোক্তার ।  তার বোন ফাতেমা মনির এখন নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান।

 

ছবি : সিনিয়র ক্রাইম রিপোর্টার এস এম  আবুুল হোসেন

হাফেজ মোক্তারের মৃত্যু নিয়ে  সিনিয়র সাংবাদিক এস এম আবুল হোসেনের লেখা স্ট্যাটাস নিচে হুবহু তুলে ধরা হলো

 

“ভাইয়া আমি খুন করিনি, ও আত্মহত্যা করেছে ।

ভাইয়া বিশ্বাস করেন আমি ওকে খুন করিনি। ও নিজের মাথায় গুলি করে আত্মহত্যা করেছে। আমি ওকে বিয়ে করতে রাজি না হওয়ায় সে এমন কাজ করছে। কাঁদতে কাঁদতে এভাবেই আমার কাছে নিজের জবানবন্দি দিচ্ছিল ফার্মগেট হলি ক্রস রোডের মেরি জিনেট শ্যামলী।
ঘটনাটি উনিশশো একান্নবই সালের উনত্রিশ নভেম্বর রাতে। অফিসে বসে কাজ করছিলাম। সে সময় সম্পাদক সাহেবের পিয়ন আব্দুল হক এসে বলেন সম্পাদক সাহেব ডাকছেন। আমি সম্পাদক সাহেবের রুমে যেতেই তিনি বলেন ফার্মগেটে একজন খুন হয়েছে জান? আমি বললাম না জানি না। সম্পাদক সাহেব টেবিলে থাকা ফোনের রিসিভার দেখিয়ে বললেন কথা বলতে। আমি রিসিভার তুলে ফোনের অপর প্রান্তে থাকা ভদ্রলোক যুবলীগ নেতা। তিনি ঘটনাস্থলের ঠিকানা ছাড়া আর কিছু বলতে পারলে না। সম্পাদক সাহেবকে ঘটনা জানালাম। তিনি দুইশো টাকা দিয়ে বললেন স্বপনকে নিয়ে চলে যাও। আমি ফটো সাংবাদিক স্বপন দা ফার্মগেটে হলি ক্রস রোডে পেয়ে গেলাম ঘটনা স্থল। ঘটনাস্থলের কাছে মানুষের ভীড়। সেখানে একটা টয়োটা গাড়ির ভিতরে পেলাম একজনের মৃতদেহ। গাড়ির এমারজেন্সি লাইট জ্বলছে। ড্রাইভিং সিটে এক ব্যক্তির মৃতদেহ। মাথার বাম পাশ রক্তাক্ত। এরই মধ্যে পুলিশ তল্লাশি করে মৃত ব্যক্তির ড্রাইভিং লাইসেন্স উদ্ধার করে। ড্রাইভিং লাইসেন্স থেকে জানা যায় নিহত ব্যক্তির নাম হাফেজ মোক্তার হোসেন। বাড়ি নারায়ণগঞ্জ জেলার ফতুল্লায়। পায়জামা পাঞ্জাবি পরা। মুখে দাঁড়ি। প্রশ্ন উঠে কে খুন করলো? ঘটনার পর পর একটি মেয়েকে গাড়ি থেকে নেমে দৌড়ে চলে যেতে দেখেছেন অনেকেই। ঘটনাস্থলের কাছে একটা কনফেকশনারি দেখে আমি সেখানে যাই। শীতের মধ্যে একটা নর্মাল পেপসি এবং দশটা বেনসন সিগারেট কিনি। পেপসি খাওয়ার সময় লক্ষ্য করি কনফেকশনারির একজন আমাকে কিছু বলতে চায়। আমি বিষয়টি সহজ করার জন্য বলি কোথা থেকে কোন মেয়ে এসে খুন করে চলে গেছে। একজন আমাকে বলেন আপনি কি সাংবাদিক? আমি হ্যা বলতেই লোকটি বলল এই লোক গাড়ি নিয়ে প্রায় এখানে আসেন এবং শ্যামলী আপার সাথে সময় কাটাতেন। আমি একটা জবাব পেয়ে গেলাম, ওই মেয়ের নাম শ্যামলী। লোকটাকে বললাম শ্যামলী কোথায় থাকে? সে আমাকে পাশের একটা গলিতে নিয়ে একটা বাসা দেখিয়ে বললেন এটা শ্যামলীর বাসা। আমি বাসায় গিয়ে দেখি দুজন মহিলা ও দুই জন পুরুষ ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে কি চাঁপা কন্ঠে কি যেন আলাপ করছে। মেয়ে দুজনের মধ্যে একজন খুবই আকর্ষণীয়া, তার মধ্যে ভীতি ভাবটা বেশি মনে হল। ছিমছাম ঘরটিতে এক পাশে ক্রুশ বিদ্ধ যিশুকে দেখে বুঝতে পারি এরা খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের।
আমাকে দেখে ওরা ভরকে যায়। আমি নিজের পরিচয় এবং সাহস দিয়ে আন্দাজে একজন মেয়েকে বললাম শ্যামলী যে কোনো সময় পুলিশ আসবে। আপনাকে আটক করে থানায় নিয়ে যাবে। আপনি আমাকে সত্যি ঘটনাটি বলেন। আমি লেখার মাধ্যমে হয়তো আপনাকে সাহায্য করতে পারবো। শ্যামলী মনে হয় আমাকে বিশ্বাস করতে পেরেছিলেন। তখন শ্যামলী বলে তার নাম ম্যারি জিনেট শ্যামলী। গুলশানের একটি হোটেলে চাকরি করেন। সেখানে হাফেজ মোক্তারের সাথে পরিচয় তারপর দুজনের ঘনিষ্ঠতা। দুই জন দেশের বাইরে প্রমোদ ভ্রমণ করেছেন। শ্যামলী জানায় হাফেজ মোক্তার বিবাহিত এবং সন্তান থাকার পরও শ্যামলীকে বিয়ের জন্য চাপ প্রয়োগ করে এবং হুমকি দেয় বিয়েতে রাজি না হলে সে নিজের মাথায় গুলি করে আত্মহত্যা করবে। সেদিন দুজন গাড়িতে বসে কথা বলার সময় হাফেজ মোক্তার নিজের লাইসেন্স করা অস্ত্র মাথায় ঠেকিয়ে শ্যামলীকে বলে আমাকে বিয়ে কর না হলে আমি নিজের মাথায় গুলি করে আত্মহত্যা করবো। শ্যামলী না বলতেই হাফেজ মোক্তার নিজের লাইসেন্স করা অস্ত্র মাথায় ঠেকিয়ে গুলি করে। ঘটনার আকস্মিকতায় শ্যামলী ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে গাড়ি থেকে নেমে দৌড়ে বাসায় চলে যায়। শ্যামলী আমাকে তিনটা ছবি দেয় তার আর হাফেজ মোক্তারের। কথা চলাকালীন তেজগাঁও থানার ওসি হাবিবুর রহমান তার ফোর্সসহ শ্যামলীকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়।
লাশ ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠানো হয়।
পরদিন ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ ডাক্তার মিজানুর রহমান, ডাক্তার প্রণব কুমার চক্রবর্তী এবং ডাক্তার আনোয়ার হোসেনের উপস্থিতিতে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। ডাক্তাররা উপস্থিত সাংবাদিকদের কিছু না বলে চলে যান। কিন্তু ডাক্তার প্রণব কুমার চক্রবর্তী আমাকে ইশার করে দেখা করতে বলেন। আমি কিছুক্ষন পরে ডাক্তার ফজলে রাব্বি ছাত্রাবাসে প্রণব দার বাসায় চলে যাই। প্রণব দা হল সুপার হওয়ার কারণে হলেই থাকতেন। তিনি স্পষ্ট করে বলে দেন এটা আত্মহত্যা। এরপর তিনি গান পয়েন্ট বিশ্লষণ করেন। কেউ নিজ মাথা গুলি করে আত্মহত্যা করলে মানুষের স্বডাবজাত ভাবে অস্ত্র মাথার কোথায় তাক করবে, মাথা থেকে গান ব্যারেল বা অস্ত্রের নলের দুরত্ব কতটুকু হবে। এরপর বলেন যে স্থানে গুলির আঘাত লেগেছে সেখানে চুলের মধ্যে গান পাউডার পাওয়া গেছে। কিন্তু আমি রিপোর্ট কি লিখব বুঝতে পারছিলাম না। প্রণব দার কথা আন অফিসিয়াল। রাতে একটু ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে লিখলাম এটা আত্মহত্যার দিকে যাবে। তিন দিন পর ময়নাতদন্তের রিপোর্টে উল্লেখ করা হয় হাফেজ মোক্তার আত্মহত্যা করেছেন। সিআইডি ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা গান এবং উদ্ধার করা বুলেট সিআইডি রাসায়নিক পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করে নিশ্চিত হন উদ্ধার করা বুলেট ওই অস্ত্রের এবং বুলেট ওই গান বা অস্ত্র থেকে বের হয়েছে। অস্ত্রে হাফেজ মোক্তারের হাতের ছাপ ছাড়া দ্বিতীয় কারো হাতের ছাপ পাওয়া যায়নি অস্ত্রের নলের মুখে চুল পাওয়া গেছে যা হাফেজ মোক্তারের মাথার চুল। দুটি সংস্থার রিপোর্ট থানায় জমা দেয়া হয়।
হাফেজ মোক্তারের পরিবার ময়নাতদন্ত রিপোর্ট নারাজি দিয়ে দ্বিতীয় দফায় ময়নাতদন্তের দাবি জানিয়ে আদালতে আবেদন করেন। একজন ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে ফতুল্লা থানার ওসি মাহমুদুল করিমের তত্ত্বাবধানে ফতুল্লা আলীগঞ্জ কবরস্থান থেকে হাফেজ মোক্তারের লাশ কবর থেকে তুলে মিটফোর্ড হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়। জীবনে প্রথম কবর থেকে লাশ উত্তোলন দেখলাম। লাশের দুর্গন্ধে আমি, ফতুল্লা থানার ওসিসহ অনেক বমি করে ফেলেন। দশ পনেরোটি গোলাপ জল ছিটানোর পরও দুর্গন্ধে আমরা দাঁড়াতে পারছিলাম না। দ্বিতীয় দফায় ময়নাতদন্তের রিপোর্ট আত্মহত্যা উল্লেখ করা হয়। রিপোর্টে উল্লেখ করা হয় ‘ বডি হাইলি ডিকম্পোজড ( পচা এবং গলিত) প্রথম ময়নাতদন্তের রিপোর্টের সাথে তারা একমত পোষণ করেন। কিন্তু হাফেজ মোক্তারের পরিবার কিছুতেই আত্মহত্যা মানতে রাজি নয়। পুলিশ রিমান্ড শেষে শ্যামলী তখন কারাগারে। তেজগাঁও থানা পুলিশ আদালতে ফাইনাল রিপোর্ট দাখিল করে। সংক্ষিপ্ত শুনানিতে অংশ নিয়ে শ্যামলীর আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল শ্যামলীর মুক্তি দাবি করেন। আদালত ফাইনাল রিপোর্ট গ্রহণ করে শ্যামলীকে নিঃশর্ত মুক্তি দিয়ে মামলাটি নিষ্পত্তি করেন।
এর তিন দিন পর আমার অফিসে একটা ফোন আসে। বলে ভাইয়া আমি শ্যামলী, আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। জানি না শ্যামলী এখন কোথায়, কেমন আছে। সেদিনের দুঃসহ স্মৃতি মনে পড়ে কিনা?

এস এম আবুল হোসেন
সিনিয়র সাংবাদিক ও লেখক।