হুইল চেয়ারে বসেই মারা গেলেন মা, ডাক্তাররা ছুঁয়েও দেখেনি’

1002

* নারায়ণগঞ্জে করোনায় মৃত্যুবরনকারী   নারীর  ছেলের আবেগঘন বক্তব্য     

মিরর বাংলাদেশ:  নারায়ণগঞ্জের বন্দরে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু বরণকারী নারীর পু্ত্র মোহাম্মদ পাভেল তার মাকে নিয়ে আবেগঘন বক্তব্য দিয়েছে। তার দাবী লাশ দাফনের আগে তারা জানতো না তার মায়ের মৃত্যু হয়েছে করোনা ভাইরাসে। কারন কুর্মিটোলা হাসপাতাল থেকে তার মা সেপটিক সেপিসিসে (নিয়মনিয়া)  মারা গেছেন ডেথ সাটিফিকেটে সেটাই লেখা হয়।  তবে ডাক্তার তাদের বলেছেন ব্রেইন স্ট্রোক করে মারা গেছে।   দাফনের দুইদিন পর আইইডিসিআর থেকে রিপোর্ট আসে তার মা করোনায় মারা গেছে।

মোবাইল ফোনে পাভেল জানান,‘মা শুধু একটি কাশি দিয়েছিল। এক কাশির অপরাধে ঢামেকে ভর্তি নেয়া হল না। কুর্মিটোলায় যখন গেলাম কোনও ডাক্তার নেই। আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা মায়ের চিকিৎসার আকুতি-মিনতি করেছি একটু ছুঁয়েও দেখেনি কেউ।

তিনি কান্নাজড়িত কন্ঠে বলেন,
মাকে ধরার জন্য সামান্য একটু হেক্সিসল চেয়েছিলাম, তাও দেয়নি। ভর্তি নেয়ার পর একজন ওয়ার্ড বয় বা নার্সও এগিয়ে আসেনি বেডে তুলতে। তাই হুইলচেয়ারে বসেই মা মারা যায়।

পাভেল জানান, আামার মা মরে যাওয়ার পর ডাক্তারের অভাব নেই। মৃত্যুর পর ডেথ সার্টিফিকেটে লেখা ছিল ব্রেন স্ট্রোক। কিন্তু মৃত্যুর দুই দিন পর ধরা পড়লো করোনা। এবার আপনারাই বলেন ব্রেন স্ট্রোক করে মারা যাওয়া মাকে কি জানাজা দেব না?
নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার রসূলবাগ এলাকায় করোনায় মৃত নারীর ছেলে মোহাম্মদ পাভেল করোনায় মৃত মা পুতুল বেগমের(৫০) ডেথ সার্টিফিকেটের কপি পাঠিয়ে তিনি আরও জানান, দেখেন কুর্মিটোলা হাসপাতাল আমার মা যে ব্রেন স্ট্রোকে মারা গেছেন, তা লিখে দিয়েছে।

তিনি ভীতি প্রকাশ করে বলেন, আমাদের বাড়িসহ এলাকার ১০০ পরিবারকে লকডাউন করা হয়েছে। বাড়ির সামনে এসে রাতের আঁধারে চিৎকার করে কে বা কারা প্রতিদিন হুমকি দিয়ে বলছে, তোদের একটা একটা করে মেরে ফেলব। কারণ আমরা নাকি করোনায় মৃত মায়ের জানাজা দিয়েছি। কিন্তু আমরাতো করোনা রোগী হিসাবে জানাজা দেয়নি। দিয়েছি ব্রেন স্ট্রোকের রোগী হিসেবে।
কারোনায় মৃত মা পুতুলের চিকিৎসা ও অসুস্থতার বিস্তুর বর্ণনা দিয়ে পাভেল আরও বলেন, আমি একটি কসমেটিক দোকানে চাকরি করি। আমার মা পুতুল দীর্ঘদিন ধরে নানা রোগে ভুগছিল। গত ২৯ মার্চ মায়ের শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। প্রথমে আমরা তাকে নারায়ণগঞ্জের একটি হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানে কোন চিকিৎসা হয়নি। পরে আমাদের পরিচিতি থাকায় শহরের অন্য হাসপাতালে নিয়ে যাই। সেখানে ডাক্তার কিছু টেস্ট দেয়। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাতাপাতালে নিয়ে যাই। সেখানে রাতে ডিউটিরত ডাক্তার মাকে বাইরে রেখে আমার সাথে কথা বলে। ওই সময় তিনি মায়ের রোগের কথা শুনে ভর্তি নেয়ার প্রস্তুতি নেয়। কিন্তু একটি কাশি সব ওলট-পালট করে দেয়। বাইরে থাকা রোগী আমার মা একটি কাশি দেয়ার সাথে সাথে ডাক্তার বলে দেয় ওনাকে ভর্তি নেয়া যাবে না। তাকে কুর্মিটোলায় নিয়ে যান। আমরা কি করব ভেবে না পেয়ে মাকে ফের নারায়ণগঞ্জ নিয়ে আসি। কিন্তু মায়ের অবস্থা আরও খারাপ হয়ে যায়। ৩০ মার্চ দুপুরের দিকে নারায়নগঞ্জের সকল ক্লিনিক ও হাসপাতালে যোগযোগ করি, কিন্তু কোথায়ও ডাক্তার নেই। পরে দুপুর ১টায় কুর্মিটোলা হাসপাতালে নিয়ে যাই। সেখানে নেওয়ার পর নার্সরা কেউ ছুঁয়েও দেখেনি। সেখানে কোন ডাক্তার ছিল না। আমি যখন মায়ের কথা বলি. নার্সরা নিজেদের মধ্যে কথা বলছিল আর হাসছিল। পরে আমি চিৎকার করলে তারা ভর্তি নেয় কুর্মিটোলার বি ওয়ার্ড ৪৭ নম্বর বেডে। কিন্তু মা খুব ভারী ছিল। আমি মাকে ধরার জন্য একটু হেক্সিসল দিতে বললে নার্সরা বলে দেয়, এগুলো সরকারি দেয়া যাবে না। ওয়ার্ডে মাকে বেডে উঠাতে আমিও আমার স্ত্রী অনুমতি পাই। দু’জন মিলে মাকে আর বেডে তুলতে পারছিলাম না। নার্সদের ডাকলাম কেউ কাছে আসেনি।
তিনি জানান,পাশের বেডে আরেক রোগীর সাথে আসা একট যুবক বলল, আমি এখানে ৫ দিনেও কোন ডাক্তার দেখিনি। পরে আমি বাইরে গিয়ে অনেক প্রতিবাদ করি। পরেই একটি অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে আসে নার্সরা। কিন্ত অক্সিজেন সরবরাহ পাইপে কোন মাস্ক লাগানো ছিল না। বাধ্য হয়ে মাকে শুধু পাইপ দিয়ে অক্সিজেন দেওয়া হয়। ধীরে ধীরে মায়ের শরীর ঠাণ্ডা হয়ে যায়। এক পর্যায়ে মা মারা যায়। মায়ের চিকিৎসার অবহেলা দেখে অনেক কাকুতি-মিনতি করেছি, বলেছি আমার কুর্মিটোলা দরকার নেই। আমার মাকে ছেড়ে দেন চলে যাব। কিন্তু নার্সরা বলে- এখানে থাকলে ১৪ দিন পর ছাড়া আর বের হতে পারবেন না। মারা যাওয়ার পর ডাক্তারের অভাব নাই। চারদিক দিয়া মায়ের লাশ ঘিরে ধরলো ডাক্তাররা। এই পরীক্ষা, সেই পরীক্ষা। ততক্ষণে আর নেই।

পাভেল জানান, মায়ের নাক দিয়ে রক্ত বের হয়েছিল। জিজ্ঞেস করাতে ডাক্তার বলে, ব্রেন স্ট্রোক করে মারা গেছে। করোনার কথা বলেওনি। ডেথ সার্টিফিকেটেও ব্রেন স্ট্রোকের কথা লেখা আছে। পরে লাশ নিয়ে স্বাভাবিকভাবে জানাজা সম্পন্ন করেছি, যেহেতু ডেথ সার্টিফিকেটে করোনার বিষয়টি ছিল না।
কিন্তু আমরা যদি জানতাম মা করোনায় মারা গেছে, তাহলে তো সতর্ক হয়ে যেতাম। এখন এলাকার মানুষজন আমাদের ওপর ক্ষিপ্ত। অনেকেই ভুল বুঝছে। এমনকি বাড়ির বাইরে এসে নানাভাবে চিৎকার করে বলে যাচ্ছে তোদের সব কয়টাকে একটা একটা করে মেরে ফেলব।

তিনি আরও জানান, আমাদের বাড়ির আশেপাশে প্রায় ১০০ পরিবারকে লকডাউন করা হয়েছে। কিন্তু অনেকের বাসায় খাদ্য নাই। অনেক সমস্যা চলছে। আমার পাশের বাড়ি লালন মিয়া ও ডলি বেগমসহ অনেকেই অভিযোগ করেছেন যে, কেউ খাবার দিয়ে যাচ্ছে না। তারা বেরও হতে পারছে না।
তিনি জানান শনিবার দুপুরে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক জসিমউদ্দিনকে জানালে তিনি বলেন, ‘আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি। ’ কিন্তু বিকালে ওই সব পরিবারের বরাত দিয়ে পাভেল ফের জানায়, জেলা প্রশাসককে তিনি অন্তত ৬-৭ বার কল করেছি সাহায্য পাঠানোর জন্য। কিন্তু জেলা প্রশাসনক ফোনই রিসিভ করেননি। পরবর্তীতে বাংলাদেশ প্রতিদিন থেকে জেলার প্রশাসকের মোবাইলে মেসেজ পাঠিয়ে ও ফোন করেও কোন সাড়া পাওয়া যায় নি।